নূরেন দুর্দানা দিহান
মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা
বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
সেশনঃ ২০১৪-১৫
অর্থনৈতিক মন্দা বা Economic recession বিশ্বব্যাপী
পরিচিত একটি টার্ম। আর এই বৈশ্বিক দূর্যোগে অর্থনৈতিক মন্দা খুব সাধারণ একটি ঘটনা। ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জন মেইনার্ড কেইনস ১৯৩৬ সালে
প্রকাশিত বই জেনারেল থিওরি অব এমপ্লয়মেন্ট, ইন্টারেস্ট অ্যান্ড মানি’-তে প্রথম এ মন্দার
প্রকৃতি উন্মোচন করেন। মন্দার কারণে অর্থনীতিতে যে খারাপ প্রভাব গুলো পড়ে এবং সেগুলোকে
উত্তরণের জন্য তিনিই মুলত প্রথম গবেষণা শুরু করেন। তিনি বলেন এই অবস্থায় মানুষের ভোগ
বা ব্যয় করার মানসিকতা (Consuming propensity) বাড়ানো গেলে ব্যবসা বাণিজ্য সম্প্রসারিত
হবে, শ্রমিক ছাটাই কমবে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান গুলো চাঙা থাকবে ইত্যাদি। ১৮০০-২০১০ পর্যন্ত
হিসেবে করলে পৃথিবীর সবচাইতে উন্নত রাষ্ট্র আমেরিকা অসংখ্যবার মন্দার মুখোমুখি হয়েছে।
জর্জ বুশ, নিক্সন, ক্লিনটন, জন এফ কেনেডী কিংবা বারাক ওবামা আর আজকের ডোনাল্ড ট্রাম্প
প্রত্যেকেরই নির্বাচনী প্রচারণায় দেশের ইকোনমিক পলিসি বরাবরের মতই প্রধান ফোকাস ছিল।
তবে মহামারীর কারণে অর্থনৈতিক মন্দা- এই টার্মটি হয়ত আমাদের জন্য নতুন। বিশ্ব করোনার
আগে এমন মহামারী দেখেছে অনেক আগে যা প্লেগ নামে পরিচিত । এখনকার চাইতে তার প্রভাব আরো
বেশী ভয়াবহ ছিল কেননা সেই সময় তথ্যের সহজলভ্যতা খুব একটা ছিলোনা আর বিশ্ববাণিজ্য বলতে
গেলে স্থবির হয়ে পড়েছিল. যার প্রভাব ছিল এখনেরর চাইতে অনেক
বেশী।
সাম্প্রতিক কালে ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
করোনা ভাইরাস বিশ্ব অর্থনীতিতে দুই দশমিক সাত ট্রিলিয়ন ডলারের লোকসান ঘটাবে, যা গোটা
যুক্তরাজ্যের জিডিপির সমান৷ করোনার প্রভাবে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দামে ২০০৮
সালের পর সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে৷ শুধু চলতি বছর ৫০ ভাগ কমে অপরিশোধিত ব্রেন্ট বিক্রি
হচ্ছে ৩৩ ডলারে৷ ওইসিডির মহাপরিচালক এঞ্জেল গুরিয়া বলেছেন, “আগামী কয়েক মাসে বিশ্বের
বড় বড় অর্থনীতির দেশগুলোতে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেবে। এবং আর্থিক ক্যালেন্ডারের
পর পর দুটি কোয়ার্টার ধরে এই মন্দা চলতে থাকবে। ‘বিশ্বব্যাপী মন্দা যদি নাও হয়, তারপরেও
বিশ্বের অনেক দেশে একেবারেই কোন প্রবৃদ্ধি হবে না অথবা কোন কোন দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির
হার হবে নিম্নমুখী’। অর্থনীতিতে ‘ক্রাউডিং
আউট’ বলে একটা ইফেক্ট আছে যেখানে বলা হয় মন্দার
সময় মানুষ ব্যাংক গুলো থেকে টাকা তুলতে থাকে এই ভয়ে যে, তার একাউন্ট থেকে টাকা উধাও
হয়ে যাবে। ফলশ্রুতিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তারল্য ঝুঁকিতে পড়ে, যা দেশের
জন্য একটি মারাত্মক সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে জন মেয়নার্ড
কেইঞ্জ বলেছেন, যেকোন মন্দা পুরোপুরি সংগঠিত হওয়ার আগেই সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে
হবে, যেমন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে আর্থিক সাহায্য, সল্প সুদে ব্যাংক গুলোকে ঋণ দেয়া
ইত্যাদি।
এক্ষেত্রে আরো একটি আলোচ্য বিষয় হচ্ছে ক্লাসিকাল ইকোনমিস্ট
এর কিছু মতবাদ। তারা ধরে নিয়েছিলেন যে ইকোনমি সম্পূর্ণ স্বনিয়ন্ত্রিত হয়ে পরিচালিত
হয়। এক্ষেত্রে সরকারের হস্তক্ষেপ যত কম থাকবে ততই ভাল এবং এমন কোন মন্দা হলে অর্থনীতি
স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আগের অবস্থানে ফিরে আসবে (Self Fulfilling Prophecy) । এটি খুবই দীর্ঘ
একটি প্রক্রিয়া এবং সল্পমেয়াদে খুবই অকার্যকর, যা দরিদ্র দেশগুলোর জন্য অসম্ভব একটি
ব্যাপার।
২০২০ সালে বাংলাদেশের জন্য করোনা ছাড়াও বন্যা ও ঘুর্ণিঝড়
একটি ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। অসংখ্য মানুষ ঘড়বাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। এছাড়াও রোহিঙ্গা
জনগোষ্ঠীর ব্যবস্থাপনাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করছে। করোনাকালীন ও করোনা পরবর্তী
বাংলাদেশকে নিয়ে যদি কিছু বলতে হয় তবে প্রথমেই যেটা আসবে তা হল ঠিক এই মুহূর্তে একটি
কার্যকরী অর্থনৈতিক পলিসি নির্ধারণ। যদিও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া মন্দার
একটি লক্ষণ, তবুও বাংলাদেশে রেকর্ড রিজার্ভ হয়েছে ৩ জুলাই পর্যন্ত ৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। মহামারীর
কারণে যেখানে রেমিট্যান্স কমে যায় সেখানে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৮ বিলিয়ন (এক হাজার ৮২০
কোটি) ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। বাংলাদেশের অর্থনীতি রেমিট্যান্স
ও একমুখী শিল্প নির্ভর যেখানে বেশিরভাগ অর্থই আসে প্রবাসীদের আয় থেকে এবং গার্মেন্টস
শিল্প থেকে। এই মুহূর্তে যদি এই সেক্টরগুলোকে
পর্যাপ্ত প্রণোদনা ও সহায়তা না দেয়া হয় অচিরেই দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে।
তাই এই মুহূর্তে আয় খুব দ্রুত উঠে আসবে এমন প্রকল্পগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে
দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। ক্ষুদ্র এবং মাঝারি উদ্যোক্তাদের আর্থিক প্রণোদনা দেয়া যেতে
পারে আর সর্বোপরি মানুষকে ব্যয় করতে উৎসাহিত করতে হবে।
ধারণা করা হচ্ছে বেকারত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে অপরাধমূলক
কর্মকান্ড বৃদ্ধি পাবে যা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। আলাদা মনিটরিং টিম গঠন করে এগুলো নিয়ে
কাজ করা যেতে পারে। বেকার জনগোষ্ঠীকে স্বল্পমেয়াদী ট্রেনিং প্রদানের মাধমে উদ্যোক্তা
তৈরির কাজ করা যেতে পারে যা একই সাথে তাদের স্বাবলম্বী করে অর্থনীতিতে অবদান রাখবে।
মানুষের প্রান্তিক ভোগ প্রবণতা (Marginal Propensity to Consume) বৃদ্ধির জন্য পলিসি হাতে নেয়া প্রয়োজন। তবে আশার
আলো হচ্ছে ইন্টারনেট এবং অনলাইন মাধ্যমের সম্প্রসারণকে কাজে লাগিয়ে অন্যন্য সেক্টর
যেমন ফুড, দেশীয় পণ্য, ই-এডুকেশন, ই-কমার্স বা এফ-কমার্স, ফ্রিল্যান্ন্সিং, ডিজিটাল
মার্কেটিং ইত্যাদি ক্ষেত্রগুলো অর্থোপার্জনের মাধ্যম হিসেবে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
এমনকি দৈনন্দিন যে কাজগুলো আমরা ফিজিক্যালি করতাম সেগুলোও ঘরে বসে করে আয়ের উৎস হিসেবে
বিবেচিত হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে এসব সেক্টরগুলো বর্ধনশীল ও গতিশীল খাত হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।
আর অর্থের লেনদেনও গতিশীল হচ্ছে। এসব খাতকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকারের পক্ষ
থেকে উন্নতমানের ট্রেনিং, প্রচার ও প্রসার করলে এগুলো হয়ে উঠবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে
অবদান রাখা কিছু সম্ভাবনাময় খাত।
মন্দার এই দুষ্ট চক্রকে সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়াও নাগরিক
হিসেবে নিজেদের জন্য কিছু করার দায়িত্বও অবশ্যই আমাদের। যেহেতু এফ-কমার্স এবং ই-কমার্স
একুশ শতকের ব্যবসা বাণিজ্যকে সহজতর করে দিয়েছে, আমরা যারা সদ্য গ্র্যাজুয়েট বা গ্র্যাজুয়েট
হওয়ার অপেক্ষায় আছি তার এই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে নানান ধরণের কোর্স করার পাশাপাশি সল্প
পরিসরে ব্যবসা শুরু করতে পারি। উপরোক্ত আলোচনার সারমর্ম এই যে, করোনা পরবর্তী যে জনশক্তি
আসছে তাকে দক্ষ মানব সম্পদ হিসেবে তথা হিউম্যান ক্যাপিটাল হিসেবে বিবেচিত হওয়ার জন্য
সরকার এবং নাগরিক উভয়েরই সহাবস্থান ও সহযোগিতা প্রয়োজন। অপেক্ষায় আছি একটু সুন্দর বাংলাদেশের।
