15 April, 2021

কিছু বলার নেইঃ জান্নাতুল ফেরদৌসী

 


কিছু বলার নেই


আমি নির্বাক, কালা হয়ে রবো;
এ জীবনে আমি অন্ধই রয়ে যাবো!

কিছু বলবো না,
শুনবো না কিছু আর;
আগ্রহ নেই নতুন কিছু দেখার।

প্রতিবার ঠকে গেছি
ফুল পাইনি কখনো;
কুড়োনো ফুলও নয়।

ভরসা দেয়নি কেউ
স্নেহ পাইনি কখনো ;
শিখিনি স্বপ্ন দেখতে।

আমি কখনো স্বাপ্নিক হতে পারিনি!
শূন্য ঝুলিটা আমার আজও খাঁ খাঁ করে,
দুমড়ানো হৃদয়টা আগের মতোই আছে।

তবুও কিছু চাই না আমি।
আমার কিছু বলার নেই;
আমি শুধু বয়ে যাবো, চিরকাল বয়ে যাবো।

জান্নাতুল ফেরদৌসী
ডিপার্টমেন্ট অফ হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট
সেশনঃ ২০১৭-২০১৮

11 April, 2021

" জীবনের খোঁজে " : আনিকা তাসনিম

                                                                 



" জীবনের খোঁজে "

সুপ্ত ভ্রুণ হতে অঙ্কুরিত 

নবীন প্রভাতের অগ্নি শিখায় আলোড়িত দেহখানি, 

বিকশিত আজি তব প্রাণের মন্ত্রধ্বনি

প্রদীপ আলোয় উজ্জীবিত নক্ষত্র সায়াহ্নের সাজেঁ

নিরন্তর চলনে ধাবমান সে জীবনের খোঁজে। 


জ্ঞান পিপাসু, তৃষ্ণার্ত চিত্ত

অবজ্ঞায় ঘৃণ্য মায়াহীন জাগতিক বিত্ত

আত্নার পরিতুষ্টি সে কি তবে বোঝে!

তবুও নিরবধি সংকীর্ণ হৃদয় তাহার জীবনের খোঁজে। 


প্রকৃতির মায়ার মূর্ছনায় মিলে সাহিত্যের সুর

মনুষ্য ক্ষিতি ক্ষান্ত সেই সুর সীমানায় বহুদূর, 

অন্তরতম প্রদেশের তৃপ্তি সে কি তবে বোঝে!

নিশ্চল জীবন ধারা অবহিত জীবনের খোঁজে। 


ধনাঢ্য, প্রাচুর্যে নহে মোহনীয় মানব প্রাণ

ধীশক্তি বলীয়ানে জোগায় তাহার চৈতন্য শান;

ব্যাপৃত কর্মে বিজড়িত কায়া উদ্বেগ অভিপ্রায় রোজে

স্রোতের প্রতিকূলে চড়ায় তরী জীবনের খোঁজে। 


ক্ষমা ও ধৃতি হোক মনুষ্যপ্রিয় অলংকার

পর্যবসিত তব হিংসা, বিদ্বেষ, সভ্যতার অহংকার;

অনুগামী জনের মহিমান্বিত মান যেন জোটে ললাটে

অস্তিমান এই নিবেদিত কর্ম তবে জীবনের খোঁজে। 


নাম :  আনিকা তাসনিম

ডিপার্টমেন্ট অফ ম্যানেজমেন্ট

সেশন : ২০১৬-২০১৭



করোনা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক ভারসাম্যঃ মোঃ আবু সায়েম


 

করোনা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক ভারসাম্য


বাংলাদেশে প্রথম করোনা ভাইরাস শনাক্তের এক বছর পূর্ণ হল কিছুদিন আগে। এই এক বছরে মানুষের জীবনধারা সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে। কেউ এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছে, কেউ পারেনি। যারা পারেনি তারা মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে; বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা।

বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক কথাবার্তা বলা নিয়ে একপ্রকার ট্যাবু কাজ করে। কেউ খোলাখুলি ভাবে নিজের মনের কথা বলতে পারেনা। ডিপ্রেশন ব্যাপারটা কেউ গুরুতরভাবে নেয়না। মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গেলে পাগল উপাধি দিয়ে দেয়। এভাবে মানসিক ভাবে অবরুদ্ধ থাকতে থাকতে অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। 

এই বছরের মার্চে প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, করোনাকালীন গত একবছরে প্রায় ১৪ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করে; যা করোনায় মৃতের সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। আত্মহত্যাকারীদের বড় একটি অংশ হচ্ছে শিক্ষার্থী এবং করোনাকালে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বেকারত্ব, ডিপ্রেশন, পারিবারিক কলহ ইত্যাদি ছাড়াও শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অবহেলাও অনেক বড় একটি কারণ। অন্যান্য দেশে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, বাংলাদেশে ততটা দেওয়া হয়না। তাছাড়া বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কখনোই শিক্ষার্থীবান্ধব ছিলোনা। করোনাকালে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের অনেক সিদ্ধান্তই শিক্ষার্থীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর। 

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক এই সমস্যার সমাধান হিসেবে রয়েছে কাউন্সেলিং। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হয়তো এটি সম্ভব নাও হতে পারে, তারপরও চেষ্টা করতে হবে যেন প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং এর ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও খেয়াল রাখতে হবে, বিশেষ করে বাবা-মাকে এবং যেকোনো বিষয় নিয়ে খোলাখুলিভাবে আলোচনা করার চেষ্টা করতে হবে। শিক্ষার্থীদেরও বুঝতে হবে যে আত্মহত্যাই একমাত্র সমাধান নয়। 

(প্রথম আলো নিউজ সোর্সঃ https://bit.ly/3vUlYbO) 

 

মোঃ আবু সায়েম

ডিপার্টমেন্ট অফ একাউন্টিং

সেশনঃ ২০১৯-২০২০



নৈরিত্রী-NoiRitri: নওরীন আক্তার


 

নৈরিত্রী-NoiRitri

আমার উদ্যোগের নাম নৈরিত্রী-NoiRitri, যাত্রা শুরু ২০২০ সালের ১১ই আগস্ট থেকে।

 

কুমিল্লার খাদি পণ্য দিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও লক্ষ্য অনুসারে নানান প্রকার দেশীয় বস্ত্রাদি আনা হয়েছে।খাদি বস্ত্রের দিকেই বেশি ঝোক,এবং তার সাথে হ্যান্ডপেইন্ট নানান কাস্টমাইজড আইটেমও অতি জনপ্রিয়। এছাড়াও কুর্তি, শাড়ি,পাঞ্জাবী প্রভৃতিতে হ্যান্ডপেইন্ট এর অর্ডার পরিপূর্ণ করি। পড়াশোনার সুবাদে চট্টগ্রাম থেকে ব্যবসা পরিচালনা করছি,ছুটিতে ঢাকা থেকে চলমান রাখি।

 

ব্যবসায়ের লক্ষ্য অতি সাধারণ, নিজের কর্মসংস্থান নিজেই করা,নিজের আত্মবিশ্বাস কে আরো দক্ষতার সাথে বৃদ্ধি করা এবং দেশীয় পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ানো।স্বপ্ন দেখি,একদিন একটি বুটিক হাউসের মালিক হব,দেশীয় পণ্যকে আরো সমৃদ্ধ করে দেশের অর্থনৈতিক খাতে অবদান রাখব।  ফি-আমানিল্লাহ।


নওরীন আক্তার
ডিপার্টমেন্ট অফ হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট
সেশনঃ ২০১৬-১৭


৭ই মার্চ: মোঃ জুলকার নাইম

৭ই মার্চ

মার্চের সপ্তম দিনের বেলা তিনটে

জনতার কল্লোল শুনা যাচ্ছে রেসকোর্স থেকে।

কারো হাতে লগি কিংবা কারো হাতে লাঙ্গল,

কৃষক ছেলে জমির মিয়া সাথে হিন্দু ছেলে শ্যামল।

আজ কেউ শান্ত নয়, স্থির নয়,

একক বন্ধনে অটুট।


সবার বুকে- চোখে মুখে ক্ষোভের তীব্র আভাস

রক্তে নজরুল- তিতুমীর, ভয়হীন শ্বাস।

কী? কী ঘটতে যাচ্ছে এই ময়দানে?

জনতার ভীড় ঠেলে কেউ আসছেন বক্তৃতার মঞ্চে,

সবাই নিশ্চুপ, আকুল অপেক্ষা।

কী বলবেন তিনি? কী চাচ্ছেন তিনি?

জয় বাংলা--------


মানুষটি শুনালেন তার অমর কবিতা,

ময়দানটি হলো সাইবেরিয়ার অগ্নুৎপাত

মুহূর্তে ছড়িয়ে গেলো সারা পূর্ব পাকিস্তানে,

শত্রুকে পরাস্ত করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র

চলে এলো সবার হাত,

পরাধীন দেশে উড়লো স্বাধীন পতাকা।


আজও জনতা স্মরণ করে সেই অগ্নুৎপাতটিকে

সেই মানুষটিকে, সেই দেশপ্রেমিককে

সেই বাংলার বন্ধু শেখ মুজিবকে।




মোঃ জুলকার নাই্ম

ডিপার্টমেন্ট অফ ম্যানেজমেন্ট

২০১৮-১৯


10 April, 2021

মায়ের বাড়ি: রাফিয়া সাফা


 মায়ের বাড়ি

অনেকক্ষণ থেকে বাসার গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে সায়ান।এখন প্রায় ৮ টা বাজে,সে নিশ্চিত মা রেগে গিয়ে গেট লক করে দিয়েছেন এবং এ মুহূর্তে মা অগ্নিমূর্তি হয়ে বারান্দায় থাকা চেয়ারে বসে রাগে গজগজ করছেন। শুধুমাত্র দেয়ালটা উঁচু বিধায় মাকে দেখা যাচ্ছে না,তাই হতাশ হয়ে গেটের বেলটা না বাজিয়েই সায়ান দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির ওপাশের অর্ধেক চুনকাম হয়ে ফেলে রাখা দেয়ালটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ কেমন যেন উদাস লাগলো সায়ানের। কেন যেন মনে হচ্ছে ওই অর্ধেক চুনকামের দেয়ালটা সে নিজে। যেমন করে বাবার না থাকাটা মায়ের অজান্তেই তাকে অর্ধেক মানুষ  বোধ করায় ঠিক তেমন।


সায়ান এবার ক্লাস টেনে।সামনেই এসএসসি পরীক্ষা। তাই মায়ের কড়া আদেশ বই ছাড়া দুনিয়ার কিছুকেই এখন চোখে দেখা যাবে না। আড্ডাবাজি করে সময় নষ্ট করা তো একদম চলবে না,আর সে কথা পুরো ভুলে গিয়ে কোচিং থেকে বের হয়ে অবনীকে ঘরে পৌঁছে দিতে গিয়ে আজ এত রাত হয়ে গেল। 

অবনী সায়ানের সাথেই পড়ে। গার্লস আর জেলা স্কুলের এই ফারাক দূর করতে করতেই অবনীকে ঠিকঠাক চোখের দেখাটাও দেখতে পারে না সে।তাই আজ সুযোগ পেয়ে আর হাতছাড়া করতে মন চায়নি তার,কিন্তু সে কথা তো আর মাকে বলা যায় না।


সায়ান তখন খুব ছোট। কত হবে বয়স?এইতো চার বা পাঁচ। সায়ানের এখনো স্পষ্ট মনে আছে এক তুমুল ঝড় বাদলের রাতে সায়ানকে কোলে নিয়ে বাবার সাথে ঝগড়া করে বাসা ছেড়ে বের হয়ে গিয়েছিল মা। কি নিয়ে সেদিন মা বাবাকে ছেড়ে এসেছিল সেটা আজও  সায়ান জানে না। তবে যে বাড়িটা সায়ান আর মা ছেড়ে এসেছিল তাদের সেই বাড়িটার কথা সায়ানের এখনো খুব মনে পড়ে।বিশাল প্লে গ্রাউন্ড সে বাড়ির ছাদে,সামনে বিশাল টেরেস। বাড়ির একটা জায়গায় ছোট একটা কাঁচের ঘর করে উপরে  ফাঁকা রাখা হয়েছিল।বৃষ্টি হলে বাবা সেই ঘরে ঢুকে বৃষ্টিতে ভিজতো,বাবা এর নাম দিয়েছিল বৃষ্টিবিলাস। মা যেদিন বাড়ি থেকে বের হয়ে আসে সেদিন বাবা খুব চেঁচিয়ে বলছিল "এক্ষুণি বের হয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে।" ওই অত সুন্দর বাড়িটা বাবার করা।  হঠাৎ সায়ানের মনে প্রশ্ন জাগলো, সেই বাড়িটাতে কি বাবা এখনো থাকে? বাবার অত বড় বাড়িতে কেন তার থাকার জায়গা হলো না?


নিজের স্যাঁতস্যাঁতে পলেস্তরা ছাড়া মুরগির খুপড়ির মত ঘরের কথা মনে করে সায়ানের হঠাৎ এত মন খারাপ হলো। বাবার করা বাড়িটার মত একটা বাড়ি হয়ত একদিন তারও হবে,তখন তার আর পলেস্তার ছাড়া শুধু ইট বসানো ঘরটায় সায়ানকে আর থাকতে হবে না। সায়ান ভাবছিল, "আচ্ছাহ প্রতিটা মানুষই কি এমন নিজের একটা ঘর হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বাঁচে?" 


এর মধ্যেই হঠাৎ গেটটা খুট করে খুলে গেল। সায়ান পিছু ফিরে দেখল মা দাঁড়িয়ে আছে। কোন কথা না বলেই মা হেঁটে যেতে শুরু করল।সায়ান সন্তপর্নে মায়ের পিছু পা বাড়ালো।


এ বাড়িতে তারা কেবল দুজন মানুষ সায়ান আর তার মা। সায়ানের মা আফরা আহমেদ একটা বাচ্চাদের স্কুলে পড়ান আর দুইটা টিউশন করান,সেই দিয়েই তাদের সংসার চলে।এই বাড়িতে মানুষ খুব কম থাকায় রাতের খাবার খাওয়া হয় খুব তাড়াতাড়ি। তারপর সায়ান রাতজেগে পড়ে আর মা পাশে বসে কখনো বই পড়েন,কখনো সেলাই করেন, কখনো বা সায়ানের সাথে অল্প সল্প গল্প করেন। এত বড় হয়ে গেছে সায়ান মা তবুও তার সাথেই ঘুমায়।ব্যাপারটা মাঝে মাঝে খুব বিরক্ত করে সায়ানকে। এত বড় ছেলেকে কেউ জড়িয়ে ধরে ঘুমায়?


এই বাড়িতে মোটেমাটে তিনটা থাকার ঘর আর একটা রান্নাঘর। বাড়িটাতে এখনো কাজ চলছে।শেষের ঘরটা আর রান্নাঘরের কাজ এখনো পুরোই বাকী।শুধু মায়ের আর তার ঘরটায় ইটের গাঁথুনি হয়েছে। কিন্তু মা মায়ের ঘরে থাকেন না।


ঘরে ঢুকেই মা সায়ানকে হাত মুখ ধুয়ে খেতে আসতে বললেন।সায়ান এখনো বুঝতে পারছে না আজ মা তাকে কেন কিছুই বলছে না,একটু বকছেও না। মাকে কেমন একটা ক্লান্ত দেখাচ্ছে। মায়ের কি তবে শরীর খারাপ?

খুব ভয়ে ভয়ে সায়ান নরম গলায় জিজ্ঞাসা করলো, "তোমার কি হয়েছে মা?কথা বলছো না যে!"

আফরা বললেন, "তাড়াতাড়ি হাতমুখ ধুয়ে খেতে আয় সায়ান।"

সায়ান আর কথা না বাড়িয়ে ফ্রেশ হতে গেলো। খাবার টেবিলে কোন শব্দ ছাড়াই মা খাওয়া শেষ করে শুতে চলে গেলেন। তখন ই সে বুঝলো মায়ের কিছু একটা নিশ্চয় হয়েছে,নাহয় এত রাত করে বাড়ি ফেরার পর ও মা তাকে কিছুই বললো না!


খাওয়া শেষ করে উঠেই সায়ান চট করে দু কাপ চা বানালো,তারপর কাপে পুরে নিয়ে মায়ের বিছানার পাশে গিয়ে বসল।সায়ানের হাতে চা দেখে মা উঠে বসলেন।

সায়ান জিজ্ঞাসা করল,"তুমি আমার সাথে রাগ করেছ মা?"

আফরা কোন কথা বললেন না শুধু একটু শব্দ করলেন "উঁহু "।

এবার সায়ান মায়ের আরেকটু কাছে চেপে বসল তারপর জিজ্ঞাসা করল "তোমার কি হয়েছে মা?"


সায়ানকে অবাক করে দিয়ে হঠাৎ আফরা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।কান্নার দমকে আফরা আহমেদের শরীর কাঁপছে। প্রথমে সায়ান বুঝতে পারল না সে কি করবে তারপর চট করে মাকে জাপটে ধরলো সে।আফরা আহমেদ কোন এক ঘরছাড়া পাখির মত ছটফট করতে লাগলেন সায়ানের বুকের কাছটায়।


কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর আফরা বললেন,"তোর নোটখাতাটা দেখলাম আজ।" হঠাৎ একথা শুনে সায়ানের বুক ধ্বক করে উঠলো,অবনীকে নিয়ে লেখাগুলো মা দেখে ফেলেনি তো!


আফরা আহমেদ একটু থেমে আবার বলা শুরু করলেন " তোর বাবাকে ছেড়ে আসলাম আজ প্রায় ১০ বছর। সেদিন সেই লোকটা যখন অন্য একজন মেয়ে নিয়ে ঘরে ঢুকলো আর আমাকে খুব মারলো  আর আমাকে তার বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বললো শুধুমাত্র সেদিন প্রতিবাদ করে বের হয়ে গিয়েছিলাম বলে আজ দশটা বছর আমি কোথাও জায়গা পাই নি সায়ান। সবার কথা যেরকমে হোক ওই লোকটার অনেক টাকা পয়সা তাই আমার তার সাথে থেকে যাওয়া উচিত ছিল।আমার ভবিষ্যৎ ভালো হতে পারত। আরও কত কথা! ছেড়ে যদি এলাম ই আর বিয়ে করলাম না কেন? ওই ঝড় বৃষ্টির রাতে যখন তোকে কোলে নিয়ে বের হয়ে যাই আমার বাবার আশ্রয়ে থাকব এই দৃঢ়তা থেকে আমি ভয় পাই নি একটুও। কিন্তু আমি ভুলে গিয়েছিলাম সায়ান,একদম ভুলে গিয়েছিলাম,"আমি যা ছেড়ে এসেছি সেটাও আমার বাড়ি নয়,যেখানে যাচ্ছি সেটাও আমার বাড়ি নয়"। ওগুলো আমার স্বামীর বাড়ি,আমার বাবার বাড়ি।
এতটুক বলে একটু দম নিলেন আফরা।

সায়ান তখন তন্ময় হয়ে তার মায়ের ছলছল চোখের দিকে তাকিয়ে আছে।

আ 

ফরা আবার বলা শুরু করলেন, যেদিন নিজের বাবাও বললো তোকে আমি কয়দিন বসিয়ে খাওয়াবো?দয়া করে, বিয়ে করে অন্য কারো ঘরে যা।সেদিন আমি বুঝলাম বাবা, আমার বা আমাদের মেয়েদের আসলে নিজের কোন বাড়ি নেই,নিজের কোন ঘর নেই। আমরা আজীবন অন্যের ঘরে থাকি। আমাদের তিনটা বাড়ি "বাবার বাড়ি, স্বামীর বাড়ি আর কবর বাড়ি।" এর আগে পরে মেয়েদের বা তোর মায়ের আর কিছুই নেই, কিছুই না। তারপর আমার নিজের বাবার ঘর থেকেও বের হয়ে এলাম,ছোট একটা চাকরী নিলাম।কিছুদিন এখানে কিছুদিন ওখানে থেকে থেকে কিছু টাকা জমিয়ে আজ একটি ইট কাল আরেকটি ইট বসিয়ে একটা"আমার ঘর" বানানোর চেষ্টা করছি।


সায়ান এখনো বুঝতে পারছে না আজ এতদিন পর মা কেন এসব কথা তাকে বলছে। সে শুধু মায়ের ক্লান্ত চোখগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। 


কিছুক্ষণ থেমে আফরা আবারো বলতে শুরু করল," আজ তোর নোটখাতাটায় একটা লাইন লেখা দেখলাম। তুই লিখেছিস," কেন আমার একটা নিজের জায়গা নেই?কেন সব মানুষের দিনশেষেই একটা খুব নিজের ঘর লাগে?"

তোর এই বাড়িটায় থাকতে একদম ভালো লাগে না তাই না বাবা? তোর খুব কষ্ট হয় তাই না বাবা? -এই বলতে বলতেই আফরা আবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন।"


সায়ান কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে বসে রইল। তার এই পনেরো বছরের জীবনে সে কখনো তার মাকে এভাবে কাঁদতে দেখে নি। আজকে কিনা শুধু একটা ঘরের কথা বলে মা এভাবে কাঁদছে?

তার হুট করে কিছুক্ষণ আগে গেটের সামনে করা তার চিন্তাগুলো মাথায় আসতে লাগলো। 


তাইতো!বাবার বাড়ি,নানার বাড়ি,দাদার বাড়ি,চাচার বাড়ি কত কত বাড়ি। কিন্তু এই এত বাড়ির ভিড়ে কোথাও একটা মায়ের বাড়ি নেই কেন? কই কখনো তো কাউকে বলতে সে শোনেনি "আমি আমার মায়ের বাড়ি যাচ্ছি।"

তাহলে কি মায়ের কথাটাই ঠিক? মেয়েদের বা মায়েদের কি নিজের কোন বাড়ি নেই?নিজের একটা জায়গা নেই?নিজের একটা ঘর নেই?


সায়ান মুহূর্তের ব্যবধানে তার মাকে জড়িয়ে ধরলো। তারপর ভবলো,সে এত অল্প বয়সে নিজের একটা ঘরের জন্য ছটফট করে।অথচ এই ছটফটানি টা মেয়েরা কত শত যুগ ধরে করে আসছে। চারিদিকে এই যে এত এত শিক্ষিত নারী,এই যে এত এত নারীশক্তির কথা বলে কত নারী,কত কত উপার্জন করে। অথচ, এদের কারোই আসলে নিজের একটা বাড়ি নেই!

একটা নিজের ঘর নেই? সত্যিকারে "আমার বাড়ি" বলার কোন জায়গা নেই!


সায়ান তার মাকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। কিছু সময় পর মায়ের চোখ থেকে নামা নদীটাকে একটু সামাল দিল।তারপর বললো,"আমার কোন কষ্ট নেই মা, আমার এই একটুখানি পলেস্তরাহীন ঘরেই সুখ, কেন জানো?"


আফরা বললেন, "কেন?"


সায়ান মৃদু হেসে বললো," কারণ এটা আমার মায়ের বাড়ি। আমি আমার মায়ের বাড়ি থাকি। পৃথিবীতে এমন কজন আছে মা যে সত্যিকারে তার মায়ের বাড়ি থাকার সুযোগ পায়?আমার কোন কষ্ট নেই মা, আমি অনেক সুখী।"


রাত বাড়লো।প্রতিদিনের মতই আফরা আহমেদ ছেলেকে জড়িয়ে ধরে তার পলেস্তারাহীন ছোট্ট ঘরে ঘুমিয়ে পড়লেন।



ঘুম আসার ঠিক আগ মুহূর্তে সায়ান তার নোট বইটা হাতে নিল।  সে লিখলো," অবনী, তোমায় আমি বলেছিলাম না একদিন আমার একটা বাড়ি হবে খুব সুন্দর,সেখানে তোমাকে নিয়ে যাবো?পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর বাড়িটার কাজ না আজ এক্ষুণি শেষ হলো। তোমাকে সেই বাড়িতে নিয়ে আসব। আমার মায়ের বাড়ি।"


আর ক্ষুদ্র অথচ গভীর অর্থবহ যে লেখাটা মা কে এত কষ্ট দিল তা ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে সে পাতাতেই লিখলো, "আমার মতো নাই তো কেউ সুখী,আমি আমার মায়ের বাড়ি থাকি।" 





রাফিয়া সাফা
ডিপার্টমেন্ট অফ ম্যানেজমেন্ট
সেশনঃ ২০১৬-১৭