11 August, 2020

এফ-কমার্সের গতিবিধি - সুপ্তি সাহা

 



সুপ্তি সাহা

ফাউন্ডার এন্ড ওনারঃ গ্যাজেট ম্যাগনেটিক জোন

সেশনঃ ২০১৬-১৭

একাউন্টিং ডিপার্টমেন্ট  

 

খুব কম মানুষই আছে, যারা দিনে একবারের জন্য হলেও ফেসবুকে লগইন না করে থাকে। ফেসবুকে আকর্ষণীয় জিনিস পত্রের দিকে মোটামুটি সবাই-ই চোখ রাখে। এক এক জন হাজির হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন পণ্যের ভান্ডার নিয়ে। এভাবেই কেউ নিজেকে তৈরি করছেন ফেসবুক উদ্যোক্তা হিসেবে কিংবা ব্যবসায়ী হিসেবে। ব্যবসা-বাণিজ্য বা চাকরির অফুরন্ত সুযোগ রয়েছে সামাজিক যোগাযোগের এই মাধ্যমটিতে।

সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে নিজের একটি অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করে আয় করার জন্য ফেসবুক হতে পারে অন্য একটি মাধ্যম। ফেসবুকে সারাদিন কারণে অকারণে আমরা প্রচুর সময় দেই। ব্যয় করা এ সময়টুকু দিয়ে ঘরে বসেই অনেক রকমের ব্যবসা গড়ে তোলা সম্ভব। ঘরে বসেই সম্ভব আয় করা। নিজেদের অর্থনৈতিক ভাবে স্বচ্ছল ও সাবলম্বী করে গড়ে তোলা যায়। এর অপর নাম ফেইসবুক কমার্স বা এফ-কমার্স৷

টাকা খরচ করে ওয়েবসাইট তৈরি না করে শুধুমাত্র ফেসবুকে একটি পেজ খুলে ব্যবসা শুরু করা যায়। ফেসবুকে লগ ইন করলেই, এরকম ব্যবসা চোখে পড়ে। সাধারণত গ্যাজেট আইটেম বা ডিভাইস সামগ্রী, শাড়ী, বিভিন্ন কাপড় চোপড়, গিফট আইটেম, নকশী কাথা, বিভিন্ন খাবার, হস্তশিল্প ইত্যাদি প্রোডাক্ট নিয়ে অনেকে ব্যবসা শুরু করে। এই ধরণের ব্যবসা করার জন্য খরচও করার প্রয়োজন হয়না, শুধু দরকার হয় নিজের সৃজনশীল মন মানসিকতা, সময় ও শ্রম। বাংলাদেশে বর্তমানে তরুণরা বা যাদের সীমিত আকারে মূলধন তারা অনেকেই এফ-কমার্সের দিকে ঝুঁকছে। বলতে গেলে গৃহিণীরা থেকে শুরু করে স্টুডেন্টরা পর্যন্ত সাবলম্বী হচ্ছে এফ কমার্সের আশীর্বাদে।  

এফ-কমার্স আর ই-কমার্সের মধ্যে দ্বন্দ্ব লাগলে সোজাভাবে বলি অনলাইনে কেনাকাটার সাথে আমরা বর্তমানের সবাই পরিচিত, এ প্রক্রিয়াটিকে ই-কমার্স বলা হয়। আর ফেসবুকের পেজ খুলে ই-কমার্স বিজনেস করলে সেটিকে, এফ-কমার্স বলে।

অনলাইন কেনাকাটা বর্তমানে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে কারণ অনেকেই এখন চায় সময় বাঁচাতে বাজারে না গিয়ে অনলাইনে পণ্য ক্রয় করতে।

নিজেদের ফেইসবুকে ব্যবসা গঠন করতে গেলে কিছু বিষয় মাথায় রাখলে সহজেই নিজের আয়ের পথ তৈরি করা সম্ভব। আমি কিছু বিষয় উল্লেখ করতে চাইঃ

- প্রোডাক্ট রিসার্চ এর ব্যাপারটা সবার প্রথমে মাথায় রাখতে হবে৷ ফেইসবুকে কি প্রোডাক্ট নিয়ে ব্যবসা করবো তা প্রথমে ঠিক করতে হবে। পাশাপাশি যে প্রোডাক্ট নিয়ে ব্যবসা করবো সে সব বিষয়ের সব ধরণের জ্ঞান রাখতে হবে। কাস্টমারদের চাহিদাসম্পন্ন পণ্য নির্ধারণ করা জরুরি। পণ্যটির উপযুক্ত সোর্স খুঁজে বের করা যাতে পণ্য সঠিক জায়গা থেকে আনা যায়, এবং সটিক দামে কিনে বিক্রি করা যায়। সব জিনিসের দাম ও মান সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকতে হবে। যাতে কাস্টমারকে সঠিক দামে সঠিক পণ্য ডেলিভারি করতে পারি৷ পণ্য সম্পর্কে রিসার্চ না করলে কাস্টমারদের সঠিক ইনফরমেশন জানানো যায় না। এতে কাস্টমারদের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। ব্যবসা বড় হলে তাতে আরও ভিন্নতা আনার জন্য অনেক প্রোডাক্ট লাইন আনা যায়। এতে ব্যবসায়ে একটা পোর্টফোলিও সৃষ্টি হয়।

- ফেসবুকে ব্যবসা গঠনে ফেইসবুক মার্কেটিং দক্ষতা অর্জন করতে হবে৷ কনটেন্ট ডেভেলপ করতে হবে। পেইজ খুলে পেইজে প্রোডাক্টের সকল ইনফরমেশন সংযুক্ত করতে হবে। পেজের সকল পোস্টে ক্রেতাদের অ্যাংগেজমেন্ট বাড়াতে ফেসবুক পেইড বুস্টিং টেকনিক গ্রহণ করতে হবে। এতে সবার সাথে কানেক্টিভিটি রাখতে সুবিধা হবে। সহজেই ব্যবসার জন্য খোলা পেজ সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।    

- সঠিক কাস্টমার পেতে অনেক বেগ পেতে হয়। কিন্তু তারপরও চেষ্টা জারি রাখলে সঠিক কাস্টমার পাওয়া কিন্তু জটিল বিষয় নয়। এ বিষয়ে নিজের কাছের বন্ধুরা অনেকটাই সাহায্য করতে পারে। তাদের মাধ্যমে অনেকের কাছে পৌঁছাতে সম্ভব। পোস্ট শেয়ার এবং পোস্ট রিভিউ দেবার মাধ্যমে। আস্তে আস্তে কাস্টমার বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং একটা কমিউনিটি থেকে আরেকটা কমিউনিটতে ব্যবসার নাম পৌঁছাতে শুরু করবে। কাস্টমারদের জন্য সাপোর্ট ম্যানেজমেন্ট এবং তাদের সাথে রিলেশন ডেভেলপ করার সর্বাক্ত চেষ্টা করতে হবে।     

- ডেলিভারি প্রসেসিং যা অনলাইন ব্যবসায়ে অনেক জরুরি। প্রাথমিক পর্যায়ে নিদিষ্ট জায়গায় ডেলিভারি দিতে সীমিত পরিসরে নিজস্ব ডেলিভারি সিস্টেম তৈরি করা। তারপর ব্যবসায়ের পণ্য বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছাতে সঠিক কুরিয়ার সার্ভিস খুঁজে বের করা। সর্বদা ডেলিভারি সার্ভিস মনিটরিং করা যাতে কাস্টমার সঠিক সময়ে পণ্যটা পায়। ডেলিভারিতে নেগেটিভ রিভিউ অনেক সময় ব্যবসায়ে সমস্যা সৃষ্টি করে।      

এবার ফেইসবুকে ব্যবসা শুরুকে কেন্দ্র করে কয়েকটি ধাপে ভাগ করে দেখানো যায়ঃ  

→ ১ম ধাপে ব্যবসা সম্পর্কিত সঠিক নাম বাছাই করে ফেসবুকে একটি পেজ তৈরি করতে হবে। পেজের নামটি হবে ব্যবসার নামে৷ নামটা ব্যবসায় বিক্রিত পণ্যের সাথে সম্পর্কিত হতে হবে। 

→ ২য় ধাপে ব্যবসায়ের জন্য একটি ইউনিক লোগো, পেজ ব্যানার, স্লোগান তৈরি করতে হবে। ব্যবসা সম্পর্কিত হবে লোগোটি। কারণ লোগো অনেক গুরুত্বপূর্ণ, এর মাধ্যমে সবাই আপনাদের ব্যবসা সম্পর্কে ধারণা পাবে। পাশাপাশি পেজের জন্য ব্যবসা সম্পর্কিত কভার ডিজাইন তৈরি করতে হবে৷ যাতে পণ্যের চিত্র তুলে ধরতে হবে। পেজ ব্যানার ও প্রোফাইল ছবি ব্যবসায়িক মানকে প্রতিনিধিত্ব করে। মানুষ প্রথমে প্রোফাইল ছবি দেখে, সেই ক্ষেত্রে প্রোফাইল ছবি কোম্পানী লোগোতে পরিণীত হয়। উন্নত লোগো, ব্যানার কিংবা কভার ফটো পেজকে অবশ্যই সুন্দর এবং প্রফেশনাল করবে। আপনার ব্যবসায়িক পেজের জন্য একটা স্লোগান নির্বাচন করুন। যেটা আপনার ক্রেতা কে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হবে।

→ ৩য় ধাপে পেজের এবাউট সেকশনে ব্যবসা সম্পর্কিত তথ্য যুক্ত করতে হবে। সেটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ হওয়া উচিত। এবাউট সেকশন কখনো খালি রাখা উচিত নয়। যে ব্যবসাটি করবেন তার বিস্তারিত তথ্য দিয়ে ফেসবুক পেজটির এবাউট সেকশনটি ভালভাবে পূরণ করুন। এতে কাস্টমার পেজ ভিজিট করতে আসলে ব্যবসা সম্পর্কিত তথ্যগুলো ভালভাবে দেখতে পাবে। এই সেকশনটি আপনার ব্যবসার প্রধান প্লাটফর্ম। মনে রাখা উচিত পেজের বেশীরভাগ সদস্য এই সেকশন ভিজিট করে জেনে নিবে আপনার ব্যবসার খুঁটিনাটি।

→ ৪র্থ ধাপে পেজে প্রাথমিকভাবে মেম্বার যুক্ত করা কারণ পেজ প্রস্তুতের পর এটা প্রধান কাজ। পেজ খুলার সাথে সাথেই পেজের মেম্বার বাড়ানোর কাজ শুরু করতে হবে। সবার প্রথমে নিজের ফ্রেন্ড লিস্টের সবাইকে, নিজের কাছের কোন বন্ধুকে অনুরোধ করে, তার ফ্রেন্ডলিস্টের সবাইকে এ পেজে যুক্ত করে নেওয়ার জন্য ইনভাইট করা শুরু করে দিতে হবে।

→ ৫ম ধাপে পেজে অ্যানগেজমেন্ট বৃদ্ধি করার কাজ করতে হবে। অ্যানগেজমেন্ট বৃদ্ধি করতে বিভিন্ন ধরনের অফার এবং সুন্দর করে পোস্ট করতে হবে বিভিন্ন ডিজাইন বানিয়ে পণ্যের আকর্ষণ বাড়াতে হবে। অ্যানগেজমেন্ট বৃদ্ধি শুরু করলে, পেজ মেম্বারও নিয়মিত বৃদ্ধি পাবে। লাইক নয়, সেল এ মনযোগ দিতে হবে। অনেকে ফেসবুকে লাইক পেলে বেশী খুশী হয়। এতে খুশী হওয়ার কোন কারণ নেই। ফেসবুকে লাইক বৃদ্ধি করে ব্যবসার জন্য লাভ নেই। ফেসবুকে লাইক বেশি থাকলে সেল বেশি হবে এটা অনেকের ধারণা। যা সম্পূর্ণ ভুল। ফেসবুক পেজে অ্যানগেজমেন্টটা সবচাইতে জরুরী। অ্যানগেজমেন্ট বৃদ্ধি করুন, সেল বেড়ে যাবে। এটাই মূল লক্ষ্য হওয়া দরকার৷  

অনলাইনে এসব ব্যবসার ক্ষেত্রে, যে ক্রেতা, তার কাছে আপনি (ব্যবসার মালিক) একদম অপরিচিত এবং অবিশ্বস্ত। সুতরাং ক্রেতা কখনও প্রোডাক্ট হাতে পাওয়ার আগে আপনাকে পেমেন্ট করতে সাহস পাবেনা। আবার আপনি নিজেও পেমেন্ট পাওয়ার আগে অপরিচিত একজনকে প্রোডাক্ট দিতে রিস্ক নিবেন না। যদি ক্রেতা আপনার পরিচিত হত, তাহলে ক্রেতা আপনাকে বিশ্বাস করতো , সেক্ষেত্রে প্রোডাক্ট হাতে পাওয়ার আগেই পেমেন্ট দিতে তার আপত্তি থাকত না। তেমনি আপনি নিজেও পেমেন্ট বাকি রেখে তাকে প্রোডাক্ট দিতে হয়ত আপত্তি করবেন না। তাহলে দেখা গেল, পরিচিত হওয়াটাই আসল। অনলাইনের মাধ্যমেই এখন মানুষের বন্ধুত্ব তৈরি হয়। আর এ বন্ধুত্ব তৈরির জন্যই অ্যানগেজমেন্ট বৃদ্ধির চেষ্টা করতে হবে। আর অ্যানগেজমেন্ট বৃদ্ধি হলেই বিশ্বাস এবং আস্থা তৈরি হবে। তখনই ক্রেতা প্রোডাক্ট হাতে পাওয়ার আগেই পেমেন্ট দিতে আপত্তি করবেনা।

→ ৬ষ্ঠ ধাপে প্রোডাক্ট বিক্রি করে কাস্টোমারদের জন্য প্রচলিত পেমেন্ট সিস্টেম সচল রাখতে হবে।  সবগুলো পেমেন্ট সিস্টেমের ব্যবস্থা করা না গেলেও চেষ্টা করতে হবে জনপ্রিয় সকল পেমেন্ট সিস্টেমগুলোতে পেমেন্ট দেওয়ার সুবিধা রাখা। বাংলাদেশের জন্য বিকাশ, ব্রাক ব্যাংক, ডাচ বাংলা ব্যাংক এই জনপ্রিয় পেমেন্ট গেটওয়েগুলোর মাধ্যমে পেমেন্টের ব্যবস্থা অবশ্যই রাখার চেষ্টা করতে হবে। সব লেনদেন সম্ভব অনুয়ায়ী স্বচ্ছ রাখার চেষ্টা জারি রাখতে হবে। তাহলেই সবার মধ্যে ব্যবসা সম্পর্কে আস্থা তৈরি হবে। এবং ব্যবসা অনেক বড় হবে, এবং সেই সাথে টিকবেও অনেকদিন।

বিষয়বস্তুর শেষ পর্যায়ে চলে আসলাম। পরিশেষে কিছু কথা বলতে চাই আমরা ফেসবুক বলতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ছবি আপলোড দেয়া বা বিভিন্ন অনুভূতি প্রকাশ বা পোষ্ট দেয়াটাকেই বুঝি। কিন্তু ফেসবুক যে মার্কেটিং এর সবচেয়ে বড় একটা মাধ্যম সেটা অনেকেই জানি না বা জানলেও এই মাধ্যম যথাযথ ভাবে ব্যবহার করতে পারছি না। আমাদের দেশে দ্রুত গতিতে বাড়ছে ইন্টারনেটের ব্যবহার, সেই সাথে বাড়ছে ইন্টারনেটের গতি। তাই বলা চলে এফ-কমার্স ব্যবসা আগামীতে অনেক এগিয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে আপনাদেরকেও এগিয়ে যেতে হলে ফেসবুক পেজ ম্যানেজ করা জানতে হবে। এটি স্মার্ট ইনকামের সুযোগ। এই ব্যবসা শুরু করতে মুলধন লাগে খুব সামান্য বা অনেক ক্ষেত্রেই লাগেনা। তাই ব্যবসাতে লস হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ঘরে বসে শুধু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রেতাদের সাথেও ব্যবসা করা যায়।

যদি আগাতে চান তাহলে ভালভাবে জানুন, স্টাডি করুন। বাজার বিশ্লেষণ করে সম্ভাবনা খতিয়ে দেখুন, আশেপাশের অভিজ্ঞদের সহায়তা নিন। প্রযুক্তি নিয়ে যত জানবেন তত ব্যবসায় প্রসারতা আনতে পারবেন। সামাজিক যোগাযোগে পারদর্শিতা ও ক্রেতাদের চাহিদামত দ্রুত পণ্য পৌঁছে দিতে পারলেই এ খাতে সফলতা পাওয়া সম্ভব। তবে উদ্যোগক্তারা শুরু করছেন কবে!