লিলি আক্তার
সেশন-২০১৭-১৮
ব্যাংকিং এন্ড ইন্সুরেন্স ডিপার্টমেন্ট
২০১৪ সাল। আমি সবে মাত্র নবম শ্রেণি থেকে
উত্তীর্ণ হয়ে দশম শ্রেণিতে পা রাখলাম। শিক্ষার্থী হিসেবে যদি নিজের কথা বলি তাহলে সেই
সময় আমি সাধারণ মানের একজন ছাত্রী ছিলাম। আমি সবসময় প্রথম সারির শিক্ষার্থীদের থেকে
দূরে দূরে থাকতাম কারণ আমার মনে হতো তারা আমার চেয়ে অনেক দূর এগিয়ে রয়েছে। সেই সময়
আমার বেস্টফ্রেন্ড হিসেবে ছিল একজন মাত্র বান্ধবী তার সাথে আমার সব কিছুতেই ছিল অমিল
তারপরও আমরা বছরের পর বছর বেস্টফ্রেন্ড হিসেবে একে অন্যের পাশে ছিলাম। যখন আমি দশম
শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলাম তখন আমাদের বিদ্যালয়ে একজন লোক কম্পিউটার কোর্সের একটা অফার
নিয়ে আমাদের বিদ্যালয়ে আসেন। সেই সময় আমাদের বিদ্যালয়ে কম্পিউটার ল্যাব কিংবা কম্পিউটার
সম্পর্কিত কোন সাবজেক্ট ছিল না। তাই আমাদের প্রধান শিক্ষকও রাজি হয়ে গেলেন এই অফারে।
ক্লাস সিক্স টু টেন পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করতে পারবে এই কোর্সে তার বিনিময়ে
আমাদের প্রদান করতে হবে কিছু কোর্স ফি। এই ফি-এর বিনিময়ে তিনি আমাদের কম্পিউটার সম্পর্কিত
অনেক কিছু শিখাবেন এবং কোর্স শেষে একটি পরীক্ষা নেওয়া হবে সেইখান থেকে প্রথম এবং দ্বিতীয়
স্থান নিবার্চন করা হবে যদিও সার্টিফিকেট দেওয়া
হবে সবাইকে কিন্তু যারা প্রথম এবং দ্বিতীয় স্থান অধিকার করবে তাদের জন্য থাকবে আরো
বিভিন্ন ধরণের সুযোগ-সুবিধা।
আমি কোন কিছু চিন্তা না করে পরের দিনই
বাসা থেকে টাকা এনে ভর্তি হয়ে গেলাম কম্পিউটার কোর্সে। আমার যেই বেস্টফ্রেন্ড ছিল সেই
ভর্তি হলো না তাই আমার ক্লাস করতে হতো একা একা। আমাদের বিদ্যালয়ে বৃহস্পতিবারের পরিবর্তে
সোমবারে টিফিন পিরিয়ডের পর ছুটি হয়ে যেত তাই সোমবারে ঠিক করা হলো কম্পিউটার কোর্সের
ক্লাস নেওয়া হবে।
শুরু হলো ক্লাস, আমি যথারীতি প্রতিটি
ক্লাসে উপস্থিত থাকতাম এবং সব ক্লাসে পিছনের বেঞ্চে বসতাম কখনো ক্লাসমেটের সাথে আবার
কখনো বা জুনিয়রদের সাথে। কোর্সের একটা নিয়ম ছিল ক্লাসে যা করাবে ক্লাস শেষে তার উপর
প্রশ্ন করা হবে এবং শিক্ষার্থীদের তার উত্তর দিতে হবে। এর মাধ্যমে বুঝা যাবে শিক্ষার্থীরা
সেই ক্লাস থেকে কতটা শিখতে পেরেছে বা বুঝতে পেরেছে। আমার একটা অভ্যাস ছিল যদিও সেটা
ভালো নাকি খারাপ নিজেও জানি না, অভ্যাসটি হলো-ক্লাসে যখন শিক্ষক জিজ্ঞেস করতেন কে কে
পড়া পারবে হাত উঠাও। আমি কখনো হাত উঠাতাম না পড়া পারি আর না পারি এই অভ্যাসটি এখনো
পর্যন্ত আমার মাঝে বিদ্যমান।
এই হাত না তোলার অভ্যাসে কম্পিউটার ক্লাসে
কখনো কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতাম না। যেই শিক্ষক আমাদের ক্লাস নিতেন তিনি ছিলেন
ইয়ং টাইপের যার ফলে অনেক মেয়ের ক্রাশ হতে সময় লাগল না স্যারের। যারাই ক্রাশ খেল তারাই
দেখতাম ক্লাসে বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য লাফালাফি করতো এবং স্যারকে তার
প্রজেক্টর গুছানো থেকে শুরু করে মাইক্রোফোন এগিয়ে দেওয়ার কাজে লিপ্ত ছিল। অনেকে দেখা
গেল এইসব করতে করতে একসময় স্যারের প্রিয় পাত্রী হয়ে উঠলেন। আমার কাজ ছিল কোন পড়া বুঝি
আর না বুঝি লাস্ট বেঞ্চে বসে ক্লাসে এটেন্ড করা। লাস্ট বেঞ্চে বসার একটা বিশাল বেনেফিট
রয়েছে তা হলো বোরিং ক্লাসে স্যারের লেকচার যখন শুনতে ইচ্ছে করে না তখন নিজেরা পিছনে
বসে মনের আনন্দে গল্প করতে পারে যা প্রথম সারির শিক্ষার্থীরা পারে না। এইভাবে বুঝা
না বুঝার ভেতর দিয়ে কখন যে কানের কাছে কোর্সের পরিসমাপ্তির ঘন্টাটা বেজে গেল বুঝতেই
পারি নি। সব ঠিকঠাক থাকলেও বিপত্তি বাধলো একটা জায়গায় গিয়ে। আমাদের বিদ্যালয়ে দুই মাস
অন্তর অন্তর ক্লাস টেস্ট হতো। রুটিনে যেইদিন ম্যাথ পরীক্ষা ছিল ঠিক সেইদিনই ম্যাথ পরীক্ষা
শেষে কম্পিউটার কোর্সের পরীক্ষা দেওয়া হলো। আমার এমনিতে ম্যাথ করতে গেলে জ্বর চলে আসে
তার উপর দিয়ে এইরকম এইটা রুটিন যারে বলে ‘মরার উপর খাড়ার ঘা’। কিছু করার ছিল না পরীক্ষা
তো দিতেই হবে কারণ পরীক্ষার বিকল্প হিসেবে
আজ পর্যন্ত কেউ কোন কিছু আবিষ্কার যে করতে পারলো না।
দেখতে দেখতে পরীক্ষার দিনও চলে আসলো।
পরীক্ষার আগের দিন রাতে ম্যাথ বই নিয়ে যখন বসলাম মনে হলো সবে মাত্র আমি এই ভুবনে অবতরণ
করলাম। কিছুই জানি না, কিছুই বুঝি না সব কেমন অজানা অচেনা। কিন্তু পড়তে যে হবে আমায়
কারণ আম্মু জানে পরীক্ষা চলছে না পড়ে উপায় নেই। আবার ম্যাথ করেও লাভ নাই কিছুই যে বুঝি
না। তখনি টেবিলের এক কোণায় চোখ পড়লো কম্পিউটার কোর্সের অবহেলিত শীটগুলোর উপরে। অনিচ্ছার
সত্ত্বেও সেইগুলো নিয়ে পড়তে লাগলাম। পরের দিন সকালে যথারীতি পরীক্ষা দিতে গেলাম সকালে
ছিল ম্যাথ পরীক্ষা আর বিকেলে ছিল কম্পিউটার কোর্সের পরীক্ষা। আমি ম্যাথ পরীক্ষায় কি
লিখেছিলাম, আদৌ কি কিছু লিখেছিলাম কিছুই মনে নেই আমার। কিন্তু স্পষ্ট মনে আছে কম্পিউটার
কোর্সের পরীক্ষার কথা। পঞ্চাশ নম্বরের পরীক্ষা ছিল ঐ কোর্সের। আমি গিয়ে বসলাম মাঝামাঝি
একটি বেঞ্চে, পরীক্ষার সময় আমি আবার পিছনে বসতে পছন্দ করি না কারণ পিছনে বসলে শিক্ষার্থীরা
বেশি ডিস্টার্ব করে। প্রশ্ন দেওয়ার পর দেখলাম রাতে যেই পড়াগুলো অনিচ্ছার স্বত্ত্বেও
জোর করে পড়েছিলাম সব এখন আমার চোখের সামনে। আমি প্রশ্ন পাওয়ার সাথে সাথে লিখতে শুরু
করে দিলাম কিন্তু কিছুক্ষণ পর মাথা তুলে যখন আশেপাশে তাকালাম এই কী অবস্থা! সবাই না
লিখে একজন আরেকজনের সাথে আলোচনা সমালোচনা করছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল ক্লাসে যেই
মেয়েগুলো বেশি প্রশ্নের উত্তর দিতে আজ তারাই কিছু লিখতে পারছে না। আমাকে লিখতে দেখে
আমার কাছ থেকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করলো অনেকেই। তারা আমার কাছ থেকে যেই প্রশ্নের উত্তরগুলোও
জিজ্ঞেস করছিল সেই প্রশ্নের উত্তরগুলোই কিন্তু তারা ক্লাসে সবার সামনে দাঁড়িয়ে দিয়েছিল।
এই সব ভাবতে ভাবতে আমি লিখা শেষ করে ফেললাম। পঞ্চাশ নম্বরের মধ্যে আমি ঊনপঞ্চাশ নম্বরের
উত্তর লিখলাম। সেই একটা প্রশ্নের উত্তর অনেকজন থেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কেউ বলতে পারে
নি। প্রশ্নটা ছিল আইএসপি অর্থ কী? কি আর করার একটা উত্তর না লিখেই খাতা জমা দিয়ে দিলাম।
এইভাবে পরিসমাপ্তি হলো কোর্সটির।
আমি আগেই বলেছি আমি ছিলাম সাধারণ মানের একজন ছাত্রী। সবে মাত্র ক্লাসে জনপ্রিয়তা লাভ করতে লাগলাম। একদিন ধর্মের শিক্ষক বললেন তুমি কি কম্পিউটার কোর্সটি করেছিলে? আমি শুধু হ্যাঁ উত্তর দিয়েছিলাম। এইভাবে আরেকদিন বাংলা ম্যামও একি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলো। কেন জিজ্ঞেস করতেন তাও বলতো না আমারও জানার কোন আগ্রহ ছিল না। এইভাবে দুই/এক মাস যাওয়ার পর শুনলাম কম্পিউটার কোর্সের নাকি রেজাল্ট দেওয়া হবে। একদিন তারিখও ঘোষণা করা হলো। ক্লাস শেষে সকল ক্লাসের শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকবৃন্দ হল রুমে গিয়ে উপস্থিত হলাম। আমি বসেছিলাম দরজার পাশে মাঝামাঝি করে একটি বেঞ্চে। এই কয়েকমাসে আমার আবার অনেক ফ্রেন্ড হয়ে গিয়েছিল। সেই সাথে কম্পিউটার পরীক্ষায় অনেক জুনিয়রকে সাহায্য করার ফলে তাদের কাছেও আমি একপ্রকার জনপ্রিয়তা লাভ করলাম। শিক্ষকগণ একে একে বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছিলেন কোর্সের ব্যাপারে পাশাপাশি আমিও বকবক করে যাচ্ছিলাম আমার ফ্রেন্ডদের সাথে। বক্তব্য পর্ব শেষ হওয়ার পর বিজয়ীদের নাম ঘোষণার পর্ব। স্যার বললেন, যেই প্রথম হয়েছে সে ঊনপঞ্চাশ এবং যে দ্বিতীয় হয়েছে সে আটচল্লিশ নম্বর পেয়েছে।
আমি মনে মনে হাসলাম, আমি তো ঊনপঞ্চাশ নম্বরের উত্তর লিখে এসেছি তাহলে আমি মনে হয় ২০/২৫ পাব।
প্রথম এবং দ্বিতীয় ছাড়া বাকিদের তো নম্বর
বলা হবে না তাই আমার নম্বরটা আর জানা হবে না। ঠিক সেই মুহুর্তে দ্বিতীয় বিজয়ীর নাম
ঘোষণা করা হলো। সে ছিল আমার পাশে বসা আমার একটা ফ্রেন্ড। সে আমার পাশ থেকে ওঠে দাঁড়ালো
খুব খুশি দেখাচ্ছিল তাকে। এরপর প্রথম জনের নাম ঘোষণা করার পালা। স্যার বললেন, প্রথম
হয়েছে 'লিলি আক্তার' সে ঊনপঞ্চাশ নম্বর পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করছে। প্রথমে আমি নামটা
খেয়াল করি নি। কিছুক্ষণ পর উপলব্ধি করলাম এটা তো আমার নাম! না, এটা হতে পারে না, স্যার
নিশ্চয় ভুল বলেছেন। আমাদের বিদ্যালয়ে ঐ নামের আরেকটি মেয়ে ছিল আমি ভেবেছিলাম স্যার
ভুল করে তার নাম বলতে গিয়ে আমার নাম বলে ফেলেছে। একটু পর দেখি পাশ থেকে আমার ফ্রেন্ডরা
আমাকে ধাক্কাছে দাঁড়ানোর জন্য। তখন আমি বুঝতে পারি প্রথম অন্য কেউ না, আমি হয়েছি।
আমি এতো বেশি সারপ্রাইজড হয়েছিলাম সেই
দিন বসা থেকে উঠে দাঁড়ানোর কথাই ভুলে গিয়েছিলাম। যখন মাইক্রোফোনে আমাকে কিছু বলতে বলা
হলো আমি কিছুই বলতে পারি নি কারণ তখনও আমি একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। আসলে ব্যাপারটা
কী হচ্ছে আমি তখনও বুঝতে পারছিলাম না। আমি আমার লাইফে প্রথমবারের মতো সারপ্রাইজড হয়েছিলাম
সেদিন যা আমি কখনো ভুলতে পারব না। এতজন শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের সামনে আমি সেইদিনই
প্রথম দাঁড়িয়ে ছিলাম সম্মানের সাথে।
ছোটবেলা থেকে আমি পড়ালেখার বাইরে কোন
প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতাম না কারণ আমি যদি কোন প্রতিযোগিতায় হেরে যাই তাহলে সেটা
নিয়ে আমার দীর্ঘদিন মন খারাপ থাকবে, যেটা আমি কখনো চাইতাম না। আম্মু আমায় সব সময় বলতো,
‘এই জীবনে তো কোনদিন কোন পুরষ্কার পেলি
না। মাঝে মধ্যে কোন প্রতিযোগিতায় তো অংশগ্রহণ করতে পারস’। আমি উত্তর দিতাম, ‘পুরষ্কার
হিসেবে তো সেই থালাবাসনই দিবে, তোমার কি থালাবাসনের অভাব পরছে? তাহলে চলো আমার সাথে
মার্কেটে তোমায় থালাবাসন কিনে দিব’। আম্মু বলতো, ‘থালাবাসন তো সবার বাসায় আছে। এইটা
একটা আনন্দ আর কি। তুই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে পুরষ্কার পাইলি’। আমি কিছু বলতাম
না চুপ করে থাকতাম। কারণ আমার যে বলার কিছু ছিল না।
সেইদিন আমার নাম ঘোষণা করার পর আম্মুর
কথা খুব মনে হচ্ছিল। ইচ্ছে করছিল এক দৌঁড়ে বাসায় গিয়ে আম্মুকে বলতে, ‘আম্মু তোমার মেয়ে
আজকে থালাবাসন থেকেও অনেক বড়কিছু পেয়েছে। সেই হেরে যাওয়ার ভয়ে জিতে গিয়েছে।‘
