11 August, 2020

বাঙালীর গ্যামোফোবিয়া - নুজাত তাসনিয়া

 


নুজাত তাসনিয়া

সেশন: ২০১৭-১৮

ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স ডিপার্টমেন্ট

 

 

নিস্তব্দ চারপাশ। অদ্রি একা দাঁড়িয়ে উঠোনে। হঠাৎ করে কেউ খুব জোরে গলা চেপে ধরল অদ্রির। এর আগেও বহুবার এভাবে গলা চেপে ধরেছে তাকে। আজ চিৎকার করে লোক জড়ো করবে সে ভেবে রেখেছে। কিন্তু নাহ..আরো জোরে চেপে ধরছে..দম বন্ধ হয়ে আসছে...আ.. ঘুম ভেঙ্গে গেল অদ্রির। টিক টিক টিক। ঘড়িতে সময় এখন সকাল ৫টা। কলেজের গন্ডি পেরিয়ে সবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা দেওয়া অদ্রির আজ বিয়ে। এই 'বিয়ে' শব্দটাই বারবার তার গলা চেপে ধরছে।

কিছুতেই কারণ খুঁজে পাচ্ছে না সে। কেন এত ভয় তার? পরিস্থিতি অনুকূলেই রয়েছে, মা-বাবা ভীষণ খুশি, ভাই বোনদের চোখে মুখে উৎসবের আমেজ সে লক্ষ্য করেছে। পাত্রপক্ষ ও বেশ আছে। তবুও এক অজানা ভয় তাকে গ্রাস করে রেখেছে, ঠিক মাঝ রাতে কেউ গলা চেপে ধরার মতো। মাকে এ নিয়ে বলতেই মা বলেছিল অমন ভয় সবাই একটু আধটু পায়। দ্বিতীয়বার বলতেই মা ধমক দিয়েছিল। বাবা কে বলবে? না, বাবার সাথে কেমন যেন একটা দূরত্ব আছে তার।

কাউকেই সে এমন ভয়ের কথা বলতেই পারছে না। অদ্রির মনে পড়ে পাশের বাড়ির সুভা আপুর কথা। আপু ও বিয়ের আগে অদ্রিকে বলেছিল তার 'বিয়ে ভয়' নিয়ে। সুভা আপু তার মায়ের কাছ থেকে কী মারটাই না খেল। প্রেমিক আছে ভেবেই আন্টি ওমন চটে গিয়েছিলেন। কিন্তু সুভা আপুর প্রেম সংক্রান্ত ব্যাপার নয় বরং বিয়েতেই ভয় ছিল। জোর করে সেই বিয়ে হলেও ১ বছরের মাথায় ডিভোর্স হয়ে সুভা আপু বাপের বাড়ি চলে আসেন।

অপ্রিয় হলেও সত্য হলো অদ্রি, সুভার মতো মেয়েরা 'গ্যামোফোবিয়া'য় ভোগে। আর ঠিক ভাবে মনের এই ভাব প্রকাশ করতে না পারার কারণেই শত অশান্তির সৃষ্টি হয়। যার পরিসমাপ্তি ঘটে বিবাহবিচ্ছেদ, অপমৃত্যু, নিযার্তনে মৃত্যুর মতো ভয়াবহতায়।

‘গ্যামোফোবিয়া' মূলত বিয়ের বন্ধন ও স্থায়ী সম্পর্কে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার ভয়কে বোঝায়। গ্রিক শব্দ 'গ্যামো' অর্থ বিয়ে ও 'ফোবিয়া' অর্থ ভয়।  

গ্যামোফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের কাছে বৈবাহিক সম্পর্ককে কখনো সরল জীবন-যাপনের হুমকিস্বরুপ মনে হয়। এছাড়াও সম্পূর্ণ নতুন একটা মানুষের সঙ্গে বসবাস ও তার পরিবারে মানিয়ে চলাকেও তারা সহজ ভাবে নিতে পারেন না।

ধারণা করা হয় বংশগতি, জিন ও মস্তিষ্কের রসায়ন এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার সম্মিলনে ফোবিয়া তৈরি হয়।

গ্যামোফোবিয়ার মাত্রা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। তাই লক্ষণগুলো ও আলাদা। যেমন-প্রচন্ড দুশ্চিন্তা,উদ্বেগ,ভয় ও আতঙ্কগ্রস্ত থাকা। অস্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস,ঘেমে যাওয়া,হৃদপিন্ডে উর্ধ্বগতি ,গলা শুকিয়ে আসা, কাঁপুনি ইত্যাদি।

গ্যামোফোবিয়ার শিকার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেয়েরা। বাংলাদেশে এর হার বেশি হওয়ার কারণ বাল্যবিবাহ,পরিবারের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক না থাকা ইত্যাদি।

একবার আপনার আশেপাশের মানুষের কথা ভাবুন তো, এমন কেউ কি আছে যিনি বিয়েতে ভয় পায়? প্রতিশ্রুতিতে যেতে চায় না? হতে পারে এমন ব্যক্তিটি আপনার মেয়ে,ছেলে,বোন কিংবা বন্ধু। আজই তার সাথে একবার কথা বলুন। মানুষগুলোর অবচেতন মনে যে সমস্যাটি লুকিয়ে আছে সেটি একবার ধরিয়ে দিলেই হয়ত তার ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা সম্ভব হবে। গ্যামোফোবিয়া ভয়ংকর কিছু নয়, কিন্তু খুব বেশি গভীরে সমস্যাগুলো চলে গেলে এই সামান্য ফোবিয়াই মৃত্যু ডেকে আনতে পারে।

অতএব,গ্যামোফোবিয়া থেকে নিস্তার পেতে পরিবারের সদস্যদের মাঝে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। যেহেতু আমাদের দেশে অধিকাংশ বাবা-মায়ের সাথে তাদের সন্তানদের দূরত্ব (communication gap) থাকেই। সেক্ষেত্রে সন্তানের পাশাপাশি বাবা-মাকে ও এগিয়ে আসতে হবে।

ক্ষেত্র বিশেষে বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন ফোবিয়ার ওষুধ দিয়ে থাকেন। কিন্তু এগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে যায়। তবে বিশেজ্ঞদের মতে, ফোবিয়ার সবচেয়ে  উপযোগী চিকিৎসা হচ্ছে হাইপোথেরাপি, সাইকোথেরাপি ও নিউরো লিঙ্গুইস্টিক প্রোগ্রামিং।