'আমাদের মেয়ে বড় হয়েছে'
অর্জুন শীলের ডিঙ্গি
মেয়েটা পইপই করে ঘুরে বেড়ায় খালে-বিলে, পাড়ার
মাঠে এমন কি বন-পাহাড়েও। গেলো পহেলা বৈশাখে
মেয়েটার বয়স পনেরো ছাড়িয়ে
ষোল ছুঁল। অথচ চালচলনে
বয়সের ভাবান্তর নেই। এখনো দুরন্ত, চঞ্চল। চোখেমুখে
রাজ্যের উচ্ছ্বাস, বাচনভঙ্গিতে হৈচৈর উপচে পড়া ভীড়। পাড়াগাঁয়ের আর পাঁচটা কুমারী মেয়ের মতোন নিজেকে গুটিয়ে নেয় নি। পুরুষ লোকদের দেখলে অঙ্গভঙ্গীর
বিশেষ ভাবান্তর হয় না। নিজের
কুমারীত্ব রক্ষার ভয়ে কুপোকাতও হয় না। সদা প্রাণবন্ত, নিজের মতো থাকে৷
বৈশাখের উত্তপ্ত দিন; বিকেল
প্রায় শেষ বলে সূর্যের
প্রতাপ অনেকটা কমে এসেছে।
ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর
হচ্ছে। দেখে মনে হবে ছায়ার বয়স এবং শরীর দুটোই ক্ষিপ্র গতিতে বাড়ছে।
যেন বড় হওয়ার খুব তাড়া। তাই সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে ছায়া। রহমতুল্লাহ
সকাল থেকেই টানা কাজ করছে। ভরদুপুরে রহমতের বউ ভাত-তরকারি নিয়ে এসেছিলো। সে সময় বউয়ের সাথে বাজার-সদাই নিয়ে শলাপরামর্শ করতে করতে খানিকটা
জিরিয়ে নিয়েছিলো। কথাবার্তা শেষে বউ চলে গেলো। আজ
প্রচন্ড গরম পড়ছে, অন্যদিনের
চেয়ে বেশি৷ রহমত কোদাল রেখে নদীর দিকে আগালো,
পানিতে ঝাঁপ দিয়ে গা ভিজিয়ে নিলো। ক্ষেতের
তিন-চার বাঁশ দূরে মস্ত বড় পাহাড়,
যা বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের সামাজিক বনায়নের অংশবিশেষ। বন
পাহাড়ে অহরহ গাছপালা, বৃক্ষের ছড়াছড়ি। তবুও কোথাও এক চিলতে বাতাস নেই৷ তবে মাতামুহুরী নদীর পাড়ে প্রকাণ্ড যে বৃক্ষটা অর্জুন শীলের বাবার জন্মের আগ থেকেও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।
তার নিচে শীতল ছায়া। সে
এক অদ্ভুত কান্ড; বাতাস নেই তবু বৃক্ষের তলে শীতল ছায়া।
গরমে অতিষ্ঠ হলেই সে বৃক্ষপানে প্রাণ ছুটে যায়৷
রোদের প্রতাপে
পায়ের নিচের বালির তাপ বেড়েই চলেছে। অবশ্য এই উত্তপ্ত বালিতে পা রেখে কাজ করা, রহমতের জন্য কঠিন হলেও নতুন কিছু নয়।তার
পায়ের শক্ত চামড়া এসবে অভ্যস্ত। গ্রীষ্মের এই সময়টাতে
ক্ষেত থেকে বাদাম তোলার দৌড়ঝাঁপ চলে। মাসটা বৈশাখ বলেই মাঝেমধ্যে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যায়। তাই কৃষকের
মনে কালবৈশাখীর চাপা আতঙ্ক থাকে।
সবকিছু লণ্ডভণ্ড হওয়ার ভয় তাড়া করে কৃষকের ভাবনায়।
আসরের আযান হয়েছে খানিকক্ষণ হলো,
নামাজের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। রহমতুল্লাহ যথাসময়ে
নামাজ আদায় করার মানুষ। ফজর এবং এশা এই
দু'ওয়াক্ত
নামাজ জামায়াতেই আদায় করেন। কিন্তু বাকি তিন ওয়াক্ত মসজিদে গিয়ে পড়ার সুযোগ হয়ে উঠে না। ক্ষেতখামারের কাজে খালেবিলে থাকতে হয় সে-সময়ে। তবে যথাসময়ে নামাজ ঠিকই আদায় করেন। কখনো বিলে, কখনো পুকুরপাড়ে,
কখনো পাহাড়ের খামার ঘরে, কখনো বা নদীর চরে। আজ কেন দেরী করেছে?
কি জানি।
তবে একটু হেরফের হলেও কাজ রেখে নদীর দিকে আগালো। ওজু সেরে আসরের নামাজ আদায় করে নিলো।
ততক্ষণে রোদের প্রতাপ কমে গেছে।
একেবারে নেই বললেই চলে। নদীর কিনায় বইতে শুরু করেছে। রহমতুল্লাহ দু'হাত তুলে স্রষ্টার কাছে ফরিয়াদ করছেন। একাগ্রচিত্তে স্রষ্টার অভিমুখে অবনত।
কিছু সময় পরে সন্ধ্যা নেমে আসবে,
দিনের আলো নিভে যাবে।
সূর্য অস্তগামী, চাঁদের দেখা মিলছে৷
অন্ধকার ঘনিয়ে এলে বৈশাখী
পূর্ণিমা তার আলো ছড়িয়ে
রাতের সৌন্দর্য বাড়াবে। হয়তো সে আলোয় বলিভিয়ার সালার দি ইউনিতে
হাতে-হাত রেখে হেঁটে
যাবে কপোত-কপোতীরা৷ গাইবে গান,
চুপিসারে বলবে ভালবাসি। কাঁধে হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করবে সারা জীবন পাশে থাকার। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আয়না খ্যাত 'সালার দি ইউনিত'
হাঁটতে হাঁটতে নুনা জলের আয়নায়
নিজেকে দেখবে; প্রিয়জনকে দেখবে। পূর্ণিমার আলোয় উদ্ভাসিত
হবে প্রেম, মায়া-মোহাব্বত।
বলিভিয়ার সালার দি ইউনি কিংবা বন্ধু রাষ্ট্রখ্যাত
ভারতের লাদাখ বা আরিজোনার
এন্টিলোপ ক্যানিয়ন অথবা ঘরের সৌন্দর্য
বান্দরবানে ক্রেওক্রাডং পাহাড়ের সাথে অর্জুন
শীলের পরিচয় নেই। থাকার
কথাও না। এসব দর্শনীয় স্থান ঘুরে আসার কল্পনা অর্জুন শীলের মনে কোন কালেই ছিলো না। তিনি নিতান্তই সাধারণ মানুষ। নির্ঝঞ্ঝাট গ্রাম্যলোক।
....
অর্জুন শীলের সাদামাটা
জীবন, কিছুটা অভাবের সংসার। তবে দিব্যি
ভালোই কেটে যাচ্ছে সময়। চোখের
পলকেই তাঁর মেয়েটা কেমন করে জানি অনেক বড় হয়ে গেলো। শেষ বিকেলের ছায়ার মতোন লম্বাচওড়া। অগ্রহায়ণের এক রাতে অর্জুন
শীলের বউ কানের কাছে এসে খানিকটা গোপনীয়তার সুরে বলেছিলো
আমাদের মেয়ে বড় হয়েছে।
সে কথা শুনে অর্জুন
মুখে কোন আনন্দ বা দুঃখ প্রকাশিত হয় নি। তবে চিন্তিত মনে হলো, এটা চিন্তা
নাকি দুশ্চিন্তা?
আমাদের সমাজে মেয়ে বড় হলে বাবা-মায়ের
মনে যে শঙ্কা সঞ্চারিত
হয়, তা থেকেই হয়তো অর্জুন শীলের এই ভাবান্তর।
অর্জুন শীল পেশায় নাপিত,
বাজারের মুখে একটা সেলুন
আছে। যেখানে নানান মনের মানুষ আসে, চুল কাটায়।
আড্ডা দেয়, সংসারে কথা বলে,
সমাজের কথা বলে, ধর্মের
কথা বলে, রাষ্ট্রের কথা বলে। সেলুনে দুইটা চেয়ার আছে,
একটার দায়িত্ব অর্জুন শীল নিজে নিয়েছে। অন্যটা তার ভাইপো
সামাল দেয়। এ সেলুন
বহু বছরের পুরনো। অর্জুন শীল পৈতৃক
সূত্রে বাপের ভিটেমাটি এবং পেশা,
দুটোই পেয়েছে। এইসব আগলে তার জীবন ভালোই কাটছে।
মনে তেমন কোন আক্ষেপ
বা অপ্রাপ্তির টানাপোড়েন নেই। তবে এখন মেয়ের বড় হওয়ার সাথে সাথে তার স্বপ্নও বড় হচ্ছে।
বছর দু'এক ধরে পয়সাকড়ি জমানোর চেষ্টা করছেন। মেয়ের বিয়ের
ভাবনা থেকেই সঞ্চয়ের পরিকল্পনা। সচরাচর অর্জুন শীল খুব হাত খোলা মানুষ৷ জীবনে আয় রোজগার কম করে নি এবং দু'হাত মেলে খরচও করেছে।
অর্জুনের বাবা ছিলেন
মিতব্যয়ী মানুষ। জীবনযাপনের ক্ষেত্রে তিনি কড়া বিধিমালা প্রণয়ন করেছিলেন। সেসব বিধিনিষেধ
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় খরচ কমানোই বিধিনিষেধের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। যার ফলে অর্জুন শীল এবং তার ভাইবোন এমনকি তার মাও শখ আহ্লাদ মেটাতে পারেন নি কখনো।
অর্জুন বিধির বেড়াজালে বেড়ে উঠেছেন ঠিক কিন্তু সে ব্যক্তিগত ভাবে খরচের
ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদার। সম্ভব
হলে মেয়েকে আকাশের চাঁদটা কিনে এনে দেয় এমন মনোভাব। যদিও তার মেয়ের কোন কিছুর প্রতি
অতিরিক্ত চাওয়া পাওয়া নেই। খেয়ালখুশি মতো দৌড়াতে পারলেই খুশীতে টইটম্বুর থাকে। মেয়েটা
বাবা-মার সাথে সাবলীল
ভাবে গল্পগুজব করে, পাড়াপড়শির সাথেও কথাবার্তা
বলে তবে আগ বাড়িয়ে
কারো সাথে ভাব জমায় না। অপর পক্ষের আগ্রহ পেলেই
সম্পর্কের গুরুত্ব দেয়। প্রচুর
কথাবার্তা বলে, গল্প জমায়।
অর্জুন অবাক বিস্ময়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে, মেয়েটা দিন দিন মায়া বাড়াচ্ছে। আশপাশের সকল কিছুতে
কেমন অদ্ভুত মায়া জড়িয়ে
দিচ্ছে। বাপের কলিজার টুকরো নয়,
যেন পুরো কলিজা হয়ে উঠছে৷
অর্জুন বাড়ির উঠানে মেয়ের জন্য একটা দোলনা বানিয়েছে। অর্জুন নিজে পাহাড়ে
গিয়ে দোলনার প্রয়োজনীয় কাঠ কেটে এনেছিলো। তা দিয়েই দোলনা
বানিয়েছে। এক দুপুরে অর্জুন দরজার চৌকাঠে
বসে রক্ত জবা ফুল গাছের দিকে তাকিয়ে আছে। গাছে অনেক ফুল ফুটেছে। গাছটা ফুলের
ভার আর রোদের তেজে ঝুঁকে পড়েছে, নিষ্প্রাণ প্রায়। গাছে প্রায়
প্রতিদিন নতুন কলিও আসে। সাজ সকালে সদ্য প্রস্ফুটিত
ফুলগুলো দেখতে বেশ সুন্দর
লাগে। কী জীবন্ত, প্রাণবন্ত, স্নিগ্ধতার ছোঁয়া। বাড়ির সামনের
পথ দিয়ে দু'জন পুরুষ মানুষ হেঁটে যাচ্ছে।
তাদের দিকে দৃষ্টিপাত হতেই অর্জুন
ফুল গাছ থেকে দৃষ্টি
ফিরিয়ে উঠানের পশ্চিম পূর্ব কোণে তাকালো। যেখানে অর্জুনের মেয়ে দোলনায়
বসে আছে।
বাবার চোখাচোখি
হতেই মেয়ের মুখে মুচকি
হাসি ফুটে উঠলো। সে হাসিতে কী নিদারুণ মায়া! অদ্ভুত মমতাভরা চাহুনি।
কিন্তু মেয়ের হাসি এড়িয়ে
অর্জুনের চোখ গেলো পথিকের
দিকে।
যারা ড্যাবড্যাব
চোখে তাকিয়ে আছে দোলনায়
বসে থাকা মেয়েটার দিকে। তাদের
সে চাহনিতে মানুষ দেখার
আগ্রহ নেই। কুমারীত্ব দেখার লোভ প্রতীয়মান...
তবে কি এই শঙ্কা থেকেই মেয়ের
বড় হওয়ার বার্তা পেয়ে অর্জুন
চিন্তিত হয়েছিলো?
সাইদুর জামান নুর শরীফ
সেশনঃ ২০১৬-১৭
ডিপার্টমেন্ট অফ ম্যানেজমেন্ট
