ভস্ম
আব্বাস দাঁড়িয়ে আছে
রাস্তার মোড়ে। নিজের
বয়সও ভালো করে
জানে না সে। কেউ
বয়স জিজ্ঞেস করলে
বলে,
নয় না না,
দশ।
আবার মাথা চুলকিয়ে বলে,
জানিনা।
এই মোড়ে হাজার
রকমের লোকের
আসা-যাওয়া।
ভিক্ষা করার জন্য এই
জায়গার চেয়ে
ভালো জায়গা সে
খুঁজে পায়নি। দশ-বারোটা পেপার
হাতে ধরে আছে। কিন্তু
একটা পেপারও আজকের
না বেশিরভাগ গতকালকের
আবার কতগুলো আছে
গত পরশুর।
আব্বাস ভালো করেই জানে
আজকাল মানুষ
তেমন পেপার পড়ে
না। তারপরও পার্ক
থেকে কয়েকটা খুঁজে
নিয়েছে।
"ভাই পাঁচটা টেকা
দেন" একথা বললে আজকাল কেউ
ভিক্ষা দেয়
না। পেপার বিক্রি
করে নিলে অনেকজনেই
পাঁচ টাকা বের
করে দেয়।
ছেলেটা কাজ করে খাচ্ছে
তাকে একটু সাহায্য
করা যায় বলে
অনেকজনকেই আব্বাস
দেখেছে টাকা
বের করে দিতে। চার-পাঁচদিন ধরে
আব্বাস পেপার
নিয়ে দাঁড়াচ্ছে তাঁর
ভালোই কামাই
হচ্ছে।
কালোমেঘে আকাশটা ঘিরে
আছে। আব্বাস রাস্তার
মোড়ে যতজন যাচ্ছে
আর যতটা গাড়ি
পার হচ্ছে সবগুলোকেই
গিয়ে গিয়ে পেপার
কিনতে বলছে।সবাই
বৃষ্টির আগমন
টের পেয়ে ছুটাছুটি
করছে, দাঁড়ানোর
সময় তেমন কারো
নেই। তারপরও দু'চারজন কিনে নিচ্ছে
পুরোনো পেপার। এতকিছুর
ভিড়েও আব্বাস
দেখল একটা কালো
রংয়ের পাজেরো
গাড়ি তার দিকে
আসছে। তার পায়ের
কাছে আসতেই গাড়িটি
থমকে দাঁড়াল।
এই ধরনের গাড়ি আব্বাস
প্রত্যেকদিন রাস্তায়
দেখে কিন্তু এইভাবে
সামনে আসতে দেখেনি।ক ট
করে গাড়ির দরজা
খোলার শব্দ
হল। আব্বাস মনযোগ
দিয়ে দেখছে। একজন
মধ্যবয়স্ক লোক
নেমে এসেছে।
চুলগুলোতে প্রায় সাদা হয়ে
আছে,চোখের নিচে
কালি পড়েছে।
রোগারোগা লোকটির পাজেরোও আছে? আব্বাস মনে
মনে ভাবল।
কাছে এসে লোকটি ধমকের
সুরে বলল,
‘এই ছেলে গাড়ির নিচে
চাপা পড়ে মরার
ইচ্ছা আছে
নাকি?এইভাবে গাড়ির
সামনে সামনে
ঘুরছ কেন?? রাস্তার বাইরে যাও।
মরার ইচ্ছে হলে অন্য
গাড়ির নিচে
যাও আমার গাড়ির
সামনে এসেছ
কেন?
কথা ঠিক কইরা কন। রাস্তার সাইডেইতো আছি। আপনে গাড়ি রাস্তার সাইডে চালাইয়া দিলে আমার কি দোষ।নিজে দোষ করেন আবার আমারে শাসান। একটু পরে যাইলে কি অয় না। সবসময় আগে যাইতে অইবো কথা আছেনি।
এই বেয়াদব ছেলে চুপ কর। মুখে মুখে তর্ক কর। দাঁত বত্রিশটা ফেলে দেব থাপ্পর দিয়ে।
আপনেরাও একখান মানুষ হক
কথা কইলেই দাঁত
ফেলাইয়া দিবেন। ভালা
কথা আগে ভাগে
কইয়া রাখি দাঁত
বত্রিশটা নাই
ফেলাইবেন কোথ্থেকে।
নিজের দোষ
মাইন্না না
লইয়া আবার আমারে
শাসাইতে আহে। আপনের
লগে তর্ক কইরবার
শখ আমার নাই।
আব্বাস পেপারগুলো হাতে নিয়ে
পেছনে ফিরে
হাঁটা শুরু
করল।লোকটি আবারো
ডাকল,
এই ছেলে...
আব্বাস ফিরে তাকাল আর বলল,
কি অয়ছে??
কাছে এসো।
আব্বাস ভয়ে ভয়ে সামনে এগুতে লাগল আর ভাবল দাঁতগুলো আজকে সত্যি যাবে নাকি?
তোমার কাছে ১২ তারিখের পেপারটা আছে??
আব্বাস অবাক হয়ে তাকাল।
আশ্চর্য! কেউ কখনো
পুরোনো পেপার
তারিখ হিসেব
করে কিনেনি আব্বাসের
কাছ থেকে। সে
মনে করেছিল দাঁতগুলো
সব যাবে এসে
দেখল অন্যকিছু।
কি হল?আছে নাকি??
আব্বাস তিন-চারটা পেপারের নিচে থেকে বের করে দিল ১২ তারিখের পেপার।
লোকটি দশটাকার চকচকে নোট দিয়ে বলল,
ধর তোমার টাকা।
আব্বাস পাঁচ টাকা ফেরত দেওয়ার আগেই বৃষ্টি শুরু হল। লোকটি দৌড়ে গিয়ে গাড়িতে ঢুকে পড়ল।আব্বাস গাড়ির জানালায় ঠুকা দিতে ছোট্ট একটি মেয়ে দেখতে পেল লোকটির পাশে বসে আছে।
আবার কি??
আপনের পাঁচ টেকা।
রেখে দাও।
আব্বাস শুনল ছোট মেয়েটি বলছে,
দাদাভাই এইটা কে??
কেউ না কেউ না।
বলেই গাড়িটা চলতে
শুরু করেছে।
আব্বাস পলিথিনের প্যাকেটে দশ
টাকাটা ঢুকিয়ে
রাখল। আরেকটা পলিথিনে
পেপারগুলো ঢুকিয়ে বগলে নিচে নিয়ে
দাঁড়িয়ে আছে। কোথায়
যেন সে শুনেছে
বৃষ্টির সময়ে
গাছের তলায়
দাঁড়ানো ঠিক
না। তাই সে
এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে
যার আশেপাশে কোন
গাছ নেই উপরে
তাকালে শুধু
বিশাল আকাশ
দেখা যায়।
বৃষ্টি থেমেছে চারদিকের অন্ধকার
হয়ে আসছে।
আব্বাসের বাড়ি ফিরতে হবে। বাড়ি
বলতে রাস্তার পাশের
ফুটপাতে একটা
ছাউনির নিচে
তাঁর মা আর
ছোট বোন মিলে
থাকে। আব্বাস হাঁটা
শুরু করল।
অন্ধকারে আব্বাস খুব ভয়
পায় তাই অল্প
আলো থাকতে বাড়ির
দিকে রওনা হয়। রাস্তার
মোড়টায় আসতেই
অনেক সময় লেগে
যায়। আব্বাস হাটছে
দ্রুত পা
ফেলে। পকেটে
পয়সার ঝনঝন
আওয়াজ হচ্ছে। কিছুপথ
যেতেই আব্বাস
থমকে দাঁড়াল।
কালো পাজেরো গাড়িটা রাস্তার
পাশে দাঁড় করানো।
আব্বাস মাথা
ঘুরিয়ে দেখল
আশেপাশে কেউ
নেই। চোখ ফিরিয়ে
নিতেই আব্বাস
দেখল বিশাল কাঁচের
প্রাচীরে ঘেরা
একটা বড় রেস্টুরেন্টে
বসে আছে মধ্যবয়স্ক
লোকটি আর
ছোট্ট মেয়েটি। আব্বাস
ভাবনার জগতে
ডুব দিল। সেই
ছোট্ট মেয়েটির
জায়াগায় নিজেকে
কল্পনা করল
আর মধ্যবয়স্ক লোকটিকে
তাঁর মা কল্পনা
করল। সে আর
তাঁর মা খাচ্ছে
নামি দামি এই
খাবারগুলো। সে বাছাই
করছে কি খাবে
বার্গার নাকি
অন্যকিছু।আব্বাস কল্পনার
জগত থেকে বের
হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস
ফেলে আবারো হাঁটা
শুরু করল। হঠাৎ
করে একটা আগুনের
ফুলকি তার
চোখের সামনে
উড়ে গেল।
সে পেছনে ফিরে দেখল
কাঁচের প্রাচীরে
ঘেরা রেস্টুরেন্টটিতে আগুন
জ্বলছে। করুণ আর্তনাদ
আব্বাসের কানে
আসছে। আব্বাস নিস্তব্ধ
হয়ে দাঁড়িয়ে দেখল
সব ভস্ম হয়ে
যাচ্ছে। সাথে তার
স্বপ্নটাও ভস্ম
হয়ে যাচ্ছে।
আব্বাস আরেক পলক পাজেরো
গাড়িটার দিকে
তাকিয়ে হাঁটা
শুরু করল।
আব্বাসের চোখ ভিজে আসছে।
আবারো ঝুম
বৃষ্টি শুরু
হয়েছে। আব্বাস কি
কাঁদছে? বৃষ্টির পানির
কারণে কিছুই
বোঝা যাচ্ছে না।
আয়শা
সিদ্দীক
সেশনঃ ২০১৭-১৮
ডিপার্টমেন্ট
অফ ব্যাংকিং এন্ড
ইন্স্যুরেন্স
