আশার আলো
রবিন, পৃথিবীর ব-দ্বীপের এক অবহেলিত গ্রামে বেড়ে উঠে। ছোটবেলা থেকেই সে কিছুটা দুষ্টু ধরনের। দুপুরবেলা মা যখন তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিতেন, সে কিছুটা ঘুমানোর ভান করতো। কিছুক্ষণ পর মা পাশ থেকে চলে গেলে, সে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেত। বিছানার ওপর বালিশগুলো সুন্দর করে সাজিয়ে তার ওপর কম্বল বিছিয়ে দিয়ে যেত, যাতে কেউ বুঝতে না পারে যে সে বিছানাতে নেই।
দুষ্টুমি যাই
করুক, ছেলেটি ছিল অত্যন্ত মেধাবী। ক্লাস রোল কখনো তার
এক থেকে দুই হয়নি। ভাগ্যের পরিহাসে এমনও হয়েছে যে, একবার
বার্ষিক পরীক্ষার আগে ছেলেটির হাত ভেঙে যায়। কী আর করার ছিল, ভাঙা
হাত নিয়ে পরিক্ষা দেয় রবিন এবং সবাইকে চমকিয়ে প্রথম স্থান অর্জন করে। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাতেও
ছিল প্রবল আগ্রহ তার, ক্রিকেট খেলায় তার বোলিং
ছিল অসাধারণ। অনেক ভালো ভালো ব্যাটসম্যানকেও তার বোলিংয়ের সামনে হার মানতে হতো।
কিন্তু, সৃষ্টিকর্তারও কী নিষ্ঠুরতা, ছেলেটি তার
কোনো ইচ্ছা কখনো মুখ ফুটে প্রকাশ করতে পারেনি, কখনো পারেনি অন্য
দশটা ছেলে-মেয়েদের মতো হাসতে, পারেনি অন্য ছেলে-মেয়েদের মতো সবার সামনে মুখ ফুটে অনর্গলভাবে ছোটো ছোটো আইনস্টাইনদের
মতো কথা বলতে। কারণ সে ছিল এক নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। জন্মের পর থেকেই শুধু অভাব-অনটন দেখেই আসছে। ঋণের কারণে তার বাবা
তাদের সমস্ত সম্পত্তি বিক্রি করে দেয়, থাকার
মতো জায়গাটুকু রাখে নি, যাতে কেউ বাটপার বলে অপবাদ না দিতে পারে।
তবুও কিছু কিছু মানুষের সমালোচনা ও নিজের
ঋণের বোঝা মাঝে মাঝে এমনও কিছু পরিস্থিতি দাঁড় করাতো যে, তাদের পরিবারের সবাইকে আত্মহত্যার পথটাই বেছে নিতে হতো।
কিন্তু ,সৃষ্টিকর্তার যে অপরূপ লীলাখেলা, সেটা বুঝার
ক্ষমতা কারো নেই। সেই যাত্রা থেকে বেঁচে যায় তারা। আবারো ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে নিরলস প্রচেষ্টা শুরু
করে তাদের পরিবার।
কিছুদিন ভালোভাবে
কাটার পর পরিস্থিতি আবারও আগের মতো হয়ে গেল। এমনও অনেক দিন গেছে, শেষ কবে খেয়েছিল সেটাও
বলতে পারত না তারা।
বাবার ব্যবসায়
বন্ধ হয়ে বসে আছে। পরিবারের সবাই খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে, অন্যদিকে রবিনের জেএসসি পরিক্ষা শুরু হয়ে গেছে। রবিনের সুযোগ হয়নি সবার
মতো ভালো কিছু খেয়ে পরিক্ষা দিতে যাওয়ার, হয়নি
সৌভাগ্য সবার মতো গাড়ি চড়ে পরিক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার। তাকে হেঁটে হেঁটে যেতে হয়েছে ৩ কিলোমিটারের বেশি পথ, পুকুর পাড় থেকে পিছন দিকে তাকিয়ে দেখতে হয়েছে মায়ের অশ্রুসিক্ত
নয়ন, শুনতে হয়েছে মায়ের সাথে বাবার ঝগড়া “তুমি কেমন বাবা? তোমার ছেলেটা আজকে পরিক্ষা দিতে যাচ্ছে
অথচ ছেলেটা কিছুই না খেয়ে গেল! কিছুই করতে পারলে না তুমি…….।” এরকম হৃদয় কাঁপানো অগণিত কথা শুনে যেতে হতো তাকে পরিক্ষা দিতে। কোনো কোনো দিন মা অন্যের
ঘর থেকে রবিনের জন্য কিছু খাবার চেয়ে নিয়ে আসতেন। কেউ দিতো তো কেউ দিতো না। ছেলের প্রতি মায়ের যে ভালোবাসা, সেটার কারণে হয়তো সব লজ্জা, অপমান ভুলে গিয়ে
অন্যের দুয়ারে গিয়ে দাঁড়াতেন তিনি।
অবশেষে, রেজাল্টের দিন আসল। রবিনের খাওয়া- দাওয়া বন্ধ হয়ে গেল চিন্তা করতে করতে। যদি সে ভালো রেজাল্ট
করতে না পারে তাহলে নিশ্চিত তার পড়াশোনা আর সামনে এগুবে না, ধূলিসাৎ হয়ে যাবে তার সকল স্বপ্ন।
দুপুর ১২ ঘটিকার
সময় তার স্কুলের একজন শিক্ষিকা তাকে ফোন করে তার পরিক্ষার রোল নাম্বারটা নিলেন। ঠিক ২-৩ মিনিটের মধ্যে ম্যাডাম আবার তাকে
ফোন দিয়ে বলেন,” রবিন, মিষ্টি নিয়ে আসো
স্কুলে তাড়াতাড়ি। তুমি জিপিএ ৫.০০ পেয়েছো”। রবিন তো খুশিতে কান্না শুরু করে দিল। কাঁদবেই বা না কেন, কিভাবে
পরীক্ষা দিয়েছে সেটাতো ভুলে যাওয়ার মতো না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তার জিপিএ ৫.০০ টি ছিল স্কুলের পাশাপাশি
এলাকায় আসা প্রথম জিপিএ ৫.০০। এলাকার সবাই এখন তাকে নিয়ে গর্ববোধ করে, সে জন্য সবার গল্পের একটা চরিত্র হয়ে গেছে। তাদের গল্পের প্রধান
চরিত্র এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশের পর হয়ে যায় সে, যখন সবাই জানতে পারে যে রবিন তাদের বিভাগের মধ্যে প্রথম হয়েছে।
যা-হোক দারিদ্রতা হয়তো তাকে একটা মহান হৃদয় নিয়ে কিভাবে সবার মাঝে
বেঁচে থাকতে হয় তা শিখিয়েছে। দরিদ্র হয়ে জন্ম নেওয়ার কারণেই হয়তো সে বুঝতে পারতো তার মতো
অন্য দশটি ছেলে-মেয়েদের দুঃখ-কষ্ট, শুনতে পারত তাদের হৃদয়বিদারক চিৎকার, যা কোনো উচ্চবিত্ত
কখনোই উপলব্ধি করার চেষ্টা করতো না।
তাইতো এইচএসসি
পরিক্ষার আগে যখন তার এক সহপাঠী জাবেদ টাকার অভাবে পারছিল না রেজিস্ট্রেশন ফি দিতে, তখন রবিন তার টিউশন থেকে
জমানো পুরো টাকা দিয়ে দেয় জাবেদকে। কলেজ পাশ করার পর, তার আরেক বন্ধু কাশেম কোচিংয়ের টাকা দিতে পারছিল না, তখন সে তার নিজের কোচিংয়ের জন্য জমিয়ে রাখা দিয়ে দেয় তার ওই বন্ধুকে। হয় নি তার স্বপ্ন পূরণের উদ্দেশ্যে কোচিং করা, সেই পথের যাত্রী হওয়ার জন্য কেনা হয় নি কোনো বই। কারণ, নিজের চেয়ে অপরের দুঃখ লাঘব করার মধ্যে পেত সে অনেক আনন্দ।
বাড়িতে একদিন
রান্না করা হয় নি কিছু ছিল না বলে। সেদিন রবিন তার কাছে থাকা ১০টাকা
দিয়ে একটি ব্রেড কিনে নেয় খাবে বলে। যখনই খাবে বলে একটি ব্রেড বের করলো
তখন তার চেয়ে কম বয়সী দুটো ছেলে-মেয়ে এসে তার সামনে
কিছু খাবে বলে হাত পেতে বসল। রবিন আর কী করবে, ওদের সাথে বসে তখন আনন্দের সহিত ব্রেডটি ভাগাভাগি করে খেয়ে নেয়।
কী হবে আমাদের
এরকম বিলাসবহুল সম্পত্তি দিয়ে, যদি না রবিনের মতো
আমরা অন্যের দুঃখে তার পাশে না দাঁড়াতে পারি; কী হবে এতো ভালো
ভালো খাবার খেয়ে, যদি না আমাদের সামনে থাকা অনাহারীদের দেখে তাদের
জন্য আমাদের মনে একটুখানিও সহানুভূতি না জাগে, ইচ্ছে না জাগে
তাদের মুখের একটু হাসির জন্য উচ্ছিষ্ট খাবারগুলোও বিলিয়ে দেওয়ার।
অন্যজন করছে
না বলে আমিও করছি না এরকম যদি সবাই করি তাহলে মানবতা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে একদিন। মানবতা শিখে নিতে হয়
না, নিজের
মধ্যেই সেটা লুকিয়ে আছে। নিজের মধ্যে থাকা পশুত্বটাকে কাটিয়ে উঠতে পারলেই সম্ভব সেটা
প্রকাশ করা, সম্ভব নিজেকে অন্যের পাশে দাঁড় করানো।
Rajib Malakar
Session: 2019-2020
Department of Management
