হঠাৎ দেখা
রবীন্দ্রনাথের হঠাৎ দেখা কবিতার মতোই তার সাথে আমার হঠাৎ দেখা তিনটি বছর পর।শেষবার যখন দেখা হয়েছিলো তার একুশে পদার্পণ। ভাবিনি আবার কখনো দেখা হবে!কিন্তু কাকতালীয়ভাবে দেখা হয়ে গেলো ট্রেনে।
নীল শাড়ীতে তাকে বেশ
সুন্দর দেখাচ্ছে। যেন শরতের বুকে একটুকরো নীলাম্বরী।মুখোমুখি সিটে বসে আছি দু-জনে।
পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি একে অপরের দিকে। শব্দহীন এই দৃষ্টি অনেকটা বিয়ের আসরে
পূর্ব অপরিচিত কনে-বরের শুভদৃষ্টির মতো কৌতূহলপূর্ণ!
তার চাহনি ঠিক আগের
মতোই আছে;হরিণের
ন্যায় টানা চোখ তার।
তখন তার দুঃখের ঠিকানা
ছিলো আমার কাঁধ,এখনো
তার অশ্রুজলের আর্দ্রতা অনুভব করি।এখন অবশ্য সেই চোখে মোটা কাজলের আবরণ পড়েছে।
তাকে দেখে বেশ সুখী'ই মনে হচ্ছে;হাতে শাঁখা আর সিঁথিতে সিঁদুরে তাকে দেবী অনুমান করলে ভুল
হবে না।তার সিঁথির সিঁদুরের নিম্নবর্তী সূর্যের গাঢ় রং যেন অস্থির গোধূলি।
জানলা দিয়ে বাইরের
দিকে তাকিয়ে এবং বই পড়ে কাটিয়ে দিলাম ঘন্টা খানেকের মতো। এতটা অচেনা কখনোই ছিলাম
না আমরা। আজ অচেনা যাত্রীর মতো একই ট্রেনের কামরায় সফর করছি প্রাক্তন প্রেমিকযুগল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের
দিনগুলিতে আমরা পাশাপাশি বসতাম শাটলে। আবদার, খুনসুঁটিতে গোপন প্রণয়ের উচ্ছ্বাস উঁকি দিতো আমাদের মাঝে।
না,পাঁচ ঘন্টার এই যাত্রা সামনা -সামনি বসে কাটানো
সম্ভব নয়।
তার সাথে কি আমার কথা
বলা উচিত!
বিংশ শতাব্দীর তরুণ-তরুণী হওয়ার সুবাদে সামাজিক যোগাযোগ
মাধ্যমের একটা বড় ভূমিকা ছিলো আমাদের প্রেমে।
হোয়াটসঅ্যাপে একটা
টেক্সট দিয়ে দেখি যদি উত্তর পাওয়া যায়!
—কেমন আছো?
কিছুক্ষণ পর অপর
প্রান্ত থেকে টেক্সট আসলো।
—ভালো।তুমি?
—তোমাকে ছাড়া কি ভালো
থাকার কথা ছিলো?
—থাক না ওসব কথা!সময়ের
সাথে সাথে সবকিছুর পরিবর্তন হয়েছে। আমাদের
জীবনধারা এবং চলার পথ এখন ভিন্ন। আমি নতুন জীবনকে অভ্যাস করে নিয়েছি। তুমিও পারবে।
—তুমি আমাকে না জানিয়ে
বিয়ে করে নিলে ?
—তোমাকে জানিয়ে অন্য
কাউকে বিয়ে করার সাহসটাআমার ছিলো না।আসলে আমার হাতে কিছুই ছিলো না।আমাদের কথা
পরিবারে জানা-জানির পর, একদিন
বাবাআমার কাছে কিছু চাইলো।বলল,আমি যেন তার পছন্দ করা ছেলেকে বিয়ে করে তাকে কন্যা দায় হতে
মুক্ত করি।বড় মেয়ে হিসেবে বাবা আমাকে সবসময় আদর- যত্নে রেখেছে। অনেক চেষ্টার পরেও যখন বাবা মেনে নিল
না।আমি বুঝতে পারলাম ভালো প্রেমিকা হওয়ার চাইতে ভালো মেয়ে হওয়াটাই আমারপরিবারের
জন্য সম্মানজনক হবে।
—আমার কথা একবারও
ভাবলে না তুমি!
—ভেবেছি। আমি তোমাকে
চিনি। তুমি বাস্তববাদী। নিজেকে ঠিক সামলে নিবে এবং তা নিয়েছো।
আচ্ছা,
আমাদের মাঝে কি এতটাই
দূরত্ব চলে এসেছে!
সামনা- সামনি থেকেও আমরা
ভার্চুয়ালি কথা বলছি।
—কিছু দূরত্বের পরিমাপ
হয় না।সকল দূরত্বের সীমা তো সেদিন অতিক্রম করেছিলো যেদিন তুমি আমাকে না জানিয়ে
বিয়ে করে নিয়েছিলে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ। তার
চোখের কোণায় জল এলো কিন্তু সে টিস্যু দিয়ে তা আড়াল করতে চাইলো।আমার বুঝতে দেরি হলো
না, প্রণয়ের সুপ্ত বহ্নি
শিখা তার মনে আজও অস্তিত্বমান।
ট্রেন কমলাপুর
রেলস্টেশনে পৌঁছাল।দু-জনেরই গন্তব্য আজ একশহরে।হয়তো এই ব্যস্ততার শহরে আবার দেখা
হয়ে যেতে পারে দু-জনের। তবেআমি চাই নাদেখা হোক।আমার অভিযোগর পাহাড় তার চলার পথে
বাঁধা সৃষ্টি করুক।
স্টেশনে দাঁড়িয়ে
অপেক্ষায় আছে তার বর্তমান।অতীত আমি খুঁজে বেড়াই না পাওয়ার কারণ।
আমার দিকে একবার
তাকালো সে,দিয়ে
গেল নীরব বিদায়।
বলার ছিলো অনেক কিছু
কিন্তু হলো না বলা!
তবে কি আমাদের আবার হবে হঠাৎ দেখা!!
জয়
পাল
সেশনঃ ২০১৬-১৭
ডিপার্টমেন্ট
অফ ফিন্যান্স
