11 August, 2020

একটি পরাবাস্তব দুঃস্বপ্ন! - রুবায়েত ইসলাম অর্ণব

 


রুবায়েত ইসলাম অর্ণব

সেশনঃ ২০১৪-১৫

ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট

 

 

ঠিক রাত ১২ টা বাজতেই সিলেট স্টেশনে পাহাড়িকা এক্সপ্রেস বিকট শব্দে হর্ণ বাজিয়ে জানান দিলো, গন্তব্যের দিকে রওনা দেয়ার জন্য তৈরি। সাথে সাথেই জন-মানুষের হই-হুল্লোড়, চিৎকার চেচাঁমেচি ইত্যাদি শেষ মুহূর্তের বাঙালির টিপিক্যাল তৎপরতায় স্বাভাবিকের চাইতেও বেড়ে গেলো। অনেকেই টিকেট না পেয়ে হা-হুতাশ করতে লাগলো, কেউ বিনা টিকিটেই উঠে পড়লো! আর ট্রেন ধীরে ধীরে চলা শুরু করার সাথে সাথেই অনেকেই ট্রেন লক্ষ্য করে দিলো ভৌ-দৌড়! তাদেরই একজন হচ্ছে মি.আনাস।

-এই এই ট্রেইন ছাইড়া দিলো!

-ধর, ধর!

মনে মনে এসব আওড়াতে আওড়াতে, দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসা গাড়ির মতো আশেপাশের মানুষদের পাশ কাটিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই ট্রেনে লাফিয়ে উঠে পড়লেন তিনি। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝতে পারলেন ভুল বগিতে উঠেছেন।

-কী আর করার! ধুউউউর!!  কফালডাই খারাপ!

মনে মনে এসব আওড়াতে অগত্যা হাঁটা দিলেন সামনের দিকে। আর খুঁজতে লাগলেন তার কাঙ্ক্ষিত বগি।

-ভাই, ঢ বগি কোনটা? এইটা?

– না ভাই! সামনে দেখেন, পেছনে দেখেন!

এইভাবে সামনে পিছে করতে শেষমেশ ট্রেনের এক ওয়েটারকে পেয়ে গেলেন তিনি।

-ভাই, এক্সকিউজ মি! ঢ বগিটা কোনদিকে, একটু বলবেন!

-হ ভাই, আসেন আমার লগে। আমিই আফনেরে নিয়া যাইতিসি।

– আর কইয়েন না ভাই, কফালডাই খারাপ। ট্রেনে উঠতে উঠতে আইজকা বেশি দেরি কইরা লাইছি!

চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ এনে যথাসম্ভব বিনয়ের একটি কম্বিনেশন তৈরির ব্যর্থ চেষ্টা চালালেন তিনি।

-আরে ভাই, এইডা বেফার নাহ। এমন হয়, হয়! হেসে হেসে বললো, ওয়েটার। আফনি আসেন আমার লগে।

স্মিত একটা হাসি দিয়ে ওয়েটারকে অনুসরণ করলো মি.আনাস।

 

প্রায় ১০-১৩ মিনিট অনেক কষ্ট করে, অনেক বগি, মানুষের উদ্ভট সব কর্মকাণ্ডকে উপেক্ষা করে, শত মানুষের লাথি, গুঁতাগুতি সহ্য করে শেষমেশ এক অসম্ভব সুন্দর বগিতে এসে পৌছালেন মিঃ আনাস।

-ওমা! এইডা আবার কী! ভিআইপি বগি নি কোনো! আমি তো এইরকম টিকেট কাটি নাই! আমার তো আছে শাটলের টিকেট কিন্তু এমন কিছুর তো নাহ! এই কই লই আইলেন ভাই!

-আরে ভাই, এতো কিছু চিন্তা কইরেন নাতো! বইয়া পড়েন আপনার সিটের নাম্বার দেইখা, আল্লাহর নাম লই। আমি অহন যাই, অনেক কাম আছে আমার।  

এই বলে, ওয়েটার বেটা গটগট করে হেঁটে চলে গেলো আর কোনো কথা না বলেই৷ মি. আনাস যদি একটু খেয়াল করতেন, তাহলে হয়তো লক্ষ্য করতেন ওয়েটারের চোখেমুখের ভঙ্গি কেমন জানি একটু অদ্ভুতই ছিলো। কেমন জানি, একটা ভয়-আর আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার মতো! যাই হোক, মি.আনাসের অত সময় নেই ঐদিকে খেয়াল করার! বগির ইন্টেরিয়র ডিজাইন তাকে হতবিহ্বল করে দিয়েছে পুরোপুরি। বগির বর্ণনা টা দেয়া যাক। টিপিক্যাল ট্রেনের বদখত চেহারা আর গড়নের চেয়ারের বদলে রয়েছে এখানে আরামদায়ক সোফা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষটাতে ভেসে বেড়াচ্ছে অপরিচিত এক সুবাস, যা মি.আনাসের নাক আগে কখনো উপভোগের সৌভাগ্য পায়নি। প্রাণভরে সেই সুবাস উপভোগ করলেন তিনি। ভেতরে রংবেরঙের সব ডিজাইন করা ঠিক ব্রিটিশ ভিক্টোরিয়া আমলের পেইন্টিঙের মতো, প্রতিটি সোফার সামনে রয়েছে মেহগনি গাছের তৈরি টেবিল আর প্রতিটা টেবিলে রাজকীয় ভঙ্গিতে কারুকাজ করা খাবারের তৈজসপত্র সাজানো৷ এর কোনো মানেই তিনি খুজে পেলেন নাহ৷ যাই হোক, খুব দ্রুত তিনি একটি সিদ্ধান্তে এলেন। 

– এতো কিছু দেইখা কী হইবো। এইটাই বগি, আরামে ঘুমাইতে ঘুমাইতে রাত টা ফার কইরা সকালে বাড়ি যাইতেইরলেই হইলো!

ভাবতে ভাবতে, টিকেটের সাথে নিজের সিটের নাম্বার মিলিয়ে তিনি বসে পড়লেন। সারাদিনের নানা অশান্তিতে ক্লান্ত শরীরটা, নরম সোফার আদর পাওয়া মাত্রই আর সহ্য করতে পারলো নাহ, তাৎক্ষণিকভাবেই ঘুমিয়ে পড়লেন তিনি। গভীর সেই ঘুম, যেন অনন্তকাল ধরে এমন আরামের ঘুম কেউ কোনোদিন যাই নাই!

হঠাৎ ঠকঠক শব্দ হতেই ঘুম ভেঙে গেলো তার। আড়মোড়া দিয়ে, হাই তুলে হাতঘড়িটার দিকে তাকালেন তিনি। ঘড়িতে বাজে বরাবর ৩.০০ টা। একদম ঘোর মধ্যরাত। হঠাৎ তার খেয়াল পড়লো তার বিপরীত দিকের সোফার দিকে। এক বিদেশীনি বসা সেখানটাই। পড়নে ব্রিটিশ ভিক্টোরিয়ান যুগের পোশাক-আশাক। মুখ দেখে বুঝা গেলো মধ্যবয়সী নারী৷ বয়স অন্তত ৪০-৪৫। চেহারাই আভিজাত্য আর কমনীয়তার ছাপ। চা তে একটা চুমুক দিয়েই তাকালেন তিনি মি. আনাসের দিকে। অসম্ভব সুন্দর নীলচোখ দুজোড়ায় কেমন জানি একটা অদ্ভুত এক লালচে আভা। মৃত্যুর উৎসব যেন চলছে ঐ দুই চোখে, এমনই মনে হবে যে কারো প্রথম দর্শনে।

-Want some tea dear? And would like to have some biscuits too?

কটমটে ব্রিটিশ উচ্চারণে, কোনোরকম ন্যাকামির স্পর্শ না রেখেই কথাগুলো বলে গেলেন তিনি।

-Personally I love to drink tea before I am having my dinner. I would love to think that it will not be problem for you my dear. Oh! Where are my manners! I am Evelyn. Mrs. Evelyn Foresyth Lenore, Duchess of the state of Irkshire (Fictional place), East of London.  Here to visit the colonies of her Majesty and enjoy the tranquillity and beauty of Eastern hemisphere. What about you my dear?

 

মি.আনাস শিক্ষিত মানুষ৷ ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী। বর্তমানে এক মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে ভালো পজিশনে থাকা মানুষ। তিনিও জবাব দিলেন

– Well, hello there Mrs. Evelyn. It is a pleasure to meet you. My name is Anas Chowdhury.

এই বলেই মি. আনাস খেয়াল করলেন মহিলার কথা অসংলগ্নতা।

-কলোনী দেখতে আইসে! মাথা ঠিক আছে নি এই বিদেশীর!

-Excuse me Mrs. Evelyn. I can’t help but notice but I think have made a mistake! This is 2019, not the age of the oppression of British ruled India.

– Oh, dear me! Mr. Anas! Ah, this is what all the others have been saying through ages but you will see that you are wrong and i am quite right.

এই বলে মুচকি কিন্তু রক্তহিম করা এক হাসি দিলেন মহিলা।

-এই বিদেশি টা মনে অয় ফাগল! কী সব আবোল তাবোল বকতেসে! হায় আল্লাহ! আজকে কি হইতাসে আমার সাথে এসব।

-Well, Mr.Anas, how about some tea. This is the best tea East Indian company can offer. I insist you have just one cup.

শেষমেশ মহিলার চাপাচাপিতে রাজি হলেন তিনি।

– এক কাপ চা ই তো খামু। ডরানোর কি আছে, ধুউর!

এই বলে চায়ে চুমুক দিলেন তিনি। আহ! এমন মিষ্টি মধুর চা তার সারাজীবনেও কখনো খান নি। মূহুর্তেই চায়ের স্বাদে আর সুঘ্রাণের সাথে তিনি হারিয়ে গেলেন অন্য এক জগতে। অদ্ভুত হ্যালুসিনেশনে ভরে উঠলো তার মন। চারপাশে তিনি দেখতে পেলেন রংবেরঙের সব চোখ ধাধানো ইল্যুশন, যা এর আগে তিনি শুধু এনিমেটেড ছবিতেই দেখেছেন।

-Well, Mrs.Evelyn, can i have some more?

– Ofcourse my dear! Why not! But how are u going to drink it.

হঠাৎ মি. আনাসের মনে হলো, সবকিছুই কেমন যেন অদ্ভুত! নিজের ভেতর কেমন যেনো অদ্ভুত এক অনূভুতি খেলা করছে। মহিলার দিকে চোখ পড়তেই তার খেয়াল হলো মহিলার চায়ের কাপে ভীষণ রকমের লাল রংয়ের পানীয়৷ কিন্তু একি চায়ের রং তো এমন হবার কথা না! হঠাৎ মি. আনাস নিজেকে ট্রেনের সিলিংয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় আবিষ্কার করলো। সাথে রক্তহীম করা এক অনুভূতি হলো তার সারা গায়ে! শরীরে বয়ে গেলো অদ্ভুত এক গা শীড়শীড়ে অনুভূতি। পরক্ষণেই ভীষণ আতঙ্কের সাথে বুঝতে পারলেন নিজের শরীরের কোমড় হতে নিম্নাংশের কোন কিছুই তিনি অনুভব করতে পারছেন নাহ। তার পা দুটো যেন নাই হয়ে গেছে মূহুর্তের মধ্যেই। নাভি হতে পা পর্যন্ত সবকিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে চারপাশে! নাড়িভুঁড়ি সব ঝুলে পড়েছে পেটের ভিতর থেকে। সেখান থেকে, চুইয়ে পড়ছে রক্ত। নিজের শরীরের ঘন লাল, লবণাক্ত স্বাদের সেই রক্ত। মনের অজান্তেই গলা থেকে বেরিয়ে এলো বিশাল এক চিৎকার, আর তার সাথে শরীরের বাকি অংশ জুড়ে অসহ্য ব্যথা আর জ্বালাপোড়া। কিন্তু, সেই চিৎকারও গলা ছেড়ে বেরোতে পারলো নাহ! কেমনে পারবে! জিহবা তো মহিলা কাটা চামচ দিয়ে আরামসে চিবোচ্ছে। দৃশ্যটি দেখে মুহূর্তের মধ্যেই সরে বাস্তবতার সকল সীমা, পরিসীমা হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। সারা বগিতে আর সেই আলো নেই, নেই আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমের কোনো ফ্যাসিলিটি।

সবই অন্ধকার, আবছা লাল আলোয় সে চারপাশে খেয়াল করলো। আশেপাশে ঝুলে আছে অসংখ্য পচা গলা অর্ধজীবিত মানুষের লাশ। সকলের মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, চরম ণীশ্তহূড়টাড় সাথেই মৃত্যু ঘটেছে তাদের। হঠাৎ আলো জ্বলে উঠলো সব লাশের চোখে, নীলচে আভার মতো অদ্ভুত এক আলো। আর সাথে প্রতিটি লাশ হয়ে উঠলো জীবন্ত আর তাদের মুখ থেকে বেড়তে লাগলো নারকীয় এক আর্তচিৎকার। অসংখ্য কন্ঠের মিলিত চিৎকারে মনে হলো, তার মতো এমন দুঃস্বপ্ন দেখছে হাজারো কয়েক অভিশপ্ত আত্মা। নীচে মহিলার অট্টহাসি শোনা গেলো আর সাথে সেই ওয়েটারের কন্ঠ।

- Ah! Such a sweet melody. It reminds me of Bethoven always. I wonder why that is!

মহিলা আপন মনেই কথাগুলা বলতে লাগলো। আর মুখে এক ক্রুর হাসি, নিষ্ঠুরতার দুঃস্বপ্ন যেনো সেখানে বাসা বেঁধেছে! তারপর ওয়েটারের দিকে মুখ ফেরালো মহিলা!

- Well, my dear Dhanonjoya. This is why i love drinking tea when I am having my dinner. It feels so nice and delicious right then. It makes the meat tender and makes it sweet and how to put it correcty!! Um, um, um squishy, I suppose. Oh dear! I just uttered a bloody Yank word. Oh well, i think that’s quite acceptable.

- Would you play something for me in the piano? The night feels so young and I am in mood for some Mozart.

 রক্ত মাখা মুখে চায়ের কাপে চুমুক দিতে, দিতে আর কাটা চামচ থেকে রানের মাংসের এক টুকরো চিবুতে চিবুতে মহিলা অনর্গল বলেই গেলো।

– Yes madam. I am glad to be of your service.

এই বলে মাথা নীচু করে, আদি ভিক্টোরিয়ান স্টাইলে বাউ করলো ধনঞ্জয়!

হাত থেকে রক্ত মুছতে মুছতে আর ধারালো ম্যাশাটে টা একপাশে সরিয়ে, কোথা হতে হাজির করলো ১৭শ শতকের দিকেরকার পুরনো এক পিয়ানো। তার হাতের স্পর্শে সেখানে বেজে উঠলো মোৎজার্টের অমর সৃষ্টি, ফ্যান্টাসিয়া ডি মাইনর।

বগির ভেতর আর সেই অপরিচিত সুভাষ নেই। পচা মাংসের উৎকট গন্ধে ভরে উঠেছে চারপাশ।

অনন্তকাল ধরে ছুটে চলেছে যেন ট্রেনটা। অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে মৃত্যু কামনায় ভরে উঠলো মি.আনাসের আত্না। কিন্তু এতো সহজেই কি আর তাই হয়!

ছুটে চলেছে ট্রেন। রাতের গভীর অন্ধকারে, অনন্ত এক অন্তহীন আধারের মধ্যদিয়ে।

পরদিন পাওয়া গেলো লাকসামে ছিন্নভিন্ন একটি অজ্ঞাত লাশ। ট্রেনে কাটা পড়া বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে চালিয়ে দেয়া হলো। পুলিশ লাশটা মরদেহ বাহী গাড়িতে উঠাতে লাগলো। সেইদিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকা এক পথশিশু লক্ষ্য করলো লাশের উপর ছিন্নভিন্ন, রক্তাক্ত এক মানুষ যন্ত্রণায় দাঁত মুখ খিঁচিয়ে গোঙাচ্ছে। আহ সেই যন্ত্রণা! অনন্তহীন, নারকীয়তার এক প্রতিফলনই মনে হবে যেকোন মানুষের চোখে। সাথে সাথেই শিশুটি লুটিয়ে পড়লো। তার দেহ নিথর হয়ে পড়ে থাকলো রাস্তার ধারে।