বই - সবসময়ের বন্ধু
'৯০ এর দশকে
বিটিভিতে ইমদাদুল
হক মিলনের লেখা 'যত দূরে যাই' খন্ড নাটক দেখে, বইটি পড়ার জন্য
ব্যাকুল হয়ে
পড়ি। পরিচিতজনদের কাছে
না পেয়ে লালদিঘির
পাড়স্থ পাবলিক
লাইব্রেরিতে গিয়ে
মনের সাধ মিঠাই।
শুরুটা ঠিক কবে
হয়েছিল মনে
নেই, তবে ক্লাস
ফাইভে পাঠ্য
কাজী ইমদাদুল হকের 'আবদুল্লাহ' উপন্যাসটি আমার
উপর খানিকটা প্রভাব
ফেলেছিলো। সৎ, সাহসী আর
ন্যায়বিচারক আবদুল্লাহ
হতে চেয়েছিলাম মনে
হয় তখন থেকেই।
স্কুল লাইফে গোয়েন্দা
সিরিজ মাসুদ
রানা আমার প্রিয়
ছিল। বন্ধুদের কাছ
থেকে দেয়া নেয়া
করে কাজী আনোয়ার
হোসেনের রানা সিরিজ ভক্ত
হয়ে পড়েছিলাম।
পরিবর্তনটা আসলো এইটে
যখন জুনিয়র স্কলারশিপ
পেলাম তখন।
আমার ছোট দাদাকে (পিডিবি'র চেয়ারম্যান
ছিলেন তখন) খুশীর সংবাদ
পাঠাই। আর
দাদা অভিনন্দন বার্তা
সমেত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের
'শকুন্তলা' বইটি উপহার
হিসেবে পাঠায়।
শকুন্তলা আর
দুস্মন্তের প্রেম, বিবাহ, বিরহ আর
পুনর্মিলনের কাহিনী
দাগ কেটেছিল মনে।
বিভিন্ন ক্লাসের পাঠ্য বইয়ের
গদ্যাংশ পড়ে
মুল বইটি পড়ার
আগ্রহ তৈরি
হয়েছিল আমার
মাঝে। কারবালার
হৃদয়বিদারক পরিণতির
পটভূমিতে মীর
মোশাররফ হোসেনের 'বিষাদসিন্ধু', বঙ্কিমচন্দ্রের 'কপালকুণ্ডলা', সৈয়দ মুজতবা আলীর ভ্রমণকাহিনী
'দেশে বিদেশে', জহির রায়হানের মুক্তিযুদ্ধে হানাদার বাহিনীর নৃশংস অত্যাচারের
বর্ননামূলক রচনা 'সময়ের প্রয়োজনে', শহীদুল্লাহ কায়সারের 'সংশপ্তক', আবু ইসহাকের
' সূর্য দীঘল
বাড়ী', আবুল মনসুর আহমদের 'আয়না', সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর ভন্ডপীর মজিদের
চরিত্র নিয়ে
রচিত 'লালসালু', ডাঃ লুৎফর রহমানের 'মানব জীবন', 'মহৎ জীবন', এমনকি শেক্সপিয়রের বাংলায় অনুদিত
ওথেলা, কিং লেয়ার, দি মার্চেন্ট অব
ভেনিস সহ
আরো বই পড়েছিলাম।
বই পড়ার শুরুটা
আসলে তখনই।
রবীন্দ্রনাথের
কাবুলিওয়ালা
মনে এত
দাগ কেটেছিল তার
ছোটগল্পসমগ্র সংগ্রহ
করে সবগুলোই পড়েছি।
হৈমন্তী, নৌকাডুবি, সমাপ্তি, নিশীথে অসাধারণ
সব সৃষ্টি। নজরুলও
পড়ার চেষ্টা করেছিলাম। 'মৃত্যুক্ষুধা' পড়েই ক্ষান্ত
দিয়েছি। মানিক
বন্দোপাধ্যায়ের 'পদ্মা নদীর
মাঝি' - কুবের এর কথা কি
ভোলা যায়! অপু আর
দূর্গা - দু'ভাইবোনের
চঞ্চল শৈশব, দূর্গার মৃত্যু, অপুর কাশীজীবন নিয়ে
লেখা বিভুতিভুষণের 'পথের পাঁচালী' না পড়া মানে
জীবনকে না
চেনা।
'মহেশ' আর 'শ্রীকান্ত' আমায় টেনেছিল
শরৎচন্দ্র সমগ্রে।
পরিনীতা, শেষের পরিচয়, গৃহদাহ উপন্যাস
ছাড়াও 'বিলাসী','বিন্দুর ছেলে','সতী','অনুপমার প্রেম','নারীর মূল্য''মামলার ফল'সহ অনেকগুলো গল্প
পড়েছিলাম একটানা।
মাঝে হুমায়ুনের প্রেমে পড়ে
গেলাম। 'ময়ূরাক্ষী' পড়েই হিমুর
জগতে ঘুরপাক আর 'বৃহন্নলা' মিসির আলীর
রহস্যভেদ বিষয়ক
গল্পসমুহ পড়তে
তাড়া করেছিল। অপ্রকৃতস্থ
বোনের সম্ভ্রম
নষ্টকারীকে হত্যা
করে জেলজীবনের সুখোল্লাসের
ঘটনা প্রবাহে রচিত 'নন্দিত নরকে' সত্যিই অসাধারণ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রথাকাকালীন তসলিমা
নাসরিনে আসক্ত
হয়েছিলাম। 'লজ্জা' দিয়ে শুরু, তারপর একেএকে 'ক', 'আমার মেয়েবেলা',
'নির্বাচিত কলাম', 'নষ্ট মেয়ের নষ্ট
গদ্য' সহ অনেক
গুলো রচনা পড়েছি।
সুনীলের 'পূর্ব-পশিচম' পাক ভারত ভাগ
হওয়ার পটভূমিতে
রচিত উপন্যাসটি অন্যতম।
সমরেশের দীপাবলীর
সংগ্রাম, ব্যর্থতা আর
না পাওয়ার কষ্ঠানুভুতির
'সাতকাহন' অর্থনৈতিক বৈষম্যের
সমাজে পরিবর্তনের
স্বপ্ন দেখা
চার বন্ধুর কাহিনীর 'গর্ভধারিণী' আর অনিমেষের
জীবন নিয়ে ধারাবাহিক
রচনা 'উত্তরাধিকার' 'কালবেলা' 'কালপুরুষ' আমার মনে
দাগ কেটেছে।
পড়েছি অনেক অখ্যাত লেখকের রচনাবলীও। শেখ মুহাম্মদ
ইব্রাহীমের 'উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান'
যেখানে '৬৬ র ছয় দফার অরিজিনাল
কথামালা সন্নিবেশিত
ছিল, মুহাম্মদ নুরুল
আলমের 'আমার দেখা
সন্দ্বীপ কলোনীর
৫০ বছর' মির্জা ইমতিয়াজ
শাওনের 'স্বপ্নের ফেরি' রফিক আনোয়ারের 'বৃষ্টি ভেজা
রোদ্দুর' জামান আহমদ
সিকদারের 'শাহানশাহ জিয়াউল
হক মাইজভান্ডারি' সুমন্ত আসলামের ' মিস্টার ৪২০' রফিকুল ইসলামের 'নোবেল বিজয়ীদের
সেরা গল্প' জ্যোতি প্রকাশ
স্যারের 'বাংলাদেশঃ সমাজ
ও অর্থনীতি' রোহিঙ্গা ইস্যুতে
তথ্যবহুল উপন্যাস
বিল্লাল মাহমুদের 'নামানুষ', উচ্চ শিক্ষায় ৮ মেধাবীর
সাফল্যগাঁথা নিয়ে
সম্পাদিত ' স্বপ্নের সীমানা পেরিয়ে' উল্লেখযোগ্য।
এপিজে আবদুল কালামের জীবনী
নিয়ে লেখা ‘উইংস অফ ফায়ার’ দুর্দান্ত। অনুপ্রেরণাদায়ক ছিল বঙ্গবন্ধুর 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী'।
গোলাম মোস্তফার 'বিশ্বনবী (সঃ) ভালো লেগেছিল।
সৈয়দ বদরুদ্দোজার 'হযরত মুহাম্মদ (সঃ) - তাঁহার শিক্ষা ও অবদান' অত্যন্ত যুক্তিনির্ভর
ও তথ্যবহুল রচনা।
হযরত আয়েশা (রাঃ), চার ইমাম,
বড়পীর হযরত
আবদুল কাদের
জিলানী - জীবন গ্রন্থসমুহ শিক্ষনীয়। মুহাম্মদ আসাদ
ও শাহেদ আলী
অনুদিত 'মক্কার পথে' ভালো লেগেছে। আরিফ আজাদের 'প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ'ও অসাধারণ।
আহমদ ছফার বৃক্ষ প্রেম নিয়ে রচিত 'পুষ্পবৃক্ষ ও বিহঙ্গ পূরাণ' মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে
রচিত 'অলাতচক্র' বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের
কর্মকাণ্ডের উপর
রচিত 'গাভী বৃত্তান্ত' মনে থাকবে আজীবন।
সমারসেট মম এর 'দি মাদার ইন
ম্যানভেলি' তে ছোট্ট
অনাথ জেরীর মাতৃস্নেহের
আকুলতা- অসাধারণ এক
রচনা।
সব গুলো নিয়ে এক আলোচনায়
শেষ হবে না।
বই পড়ার গল্পগুলো
বলার উদ্দেশ্য ছিল
অলস সময়, হতাশার সময়
কিংবা নিঃসঙ্গ
জীবনের একমাত্র
বন্ধু কে
হতে পারে তা
জানানোর জন্য।
শুধু তাই নয়
প্রকৃত শিক্ষাও
অর্জন হয়
তাতে। লকডাউনে
আমি বই পড়েছি, ভালো সময় পার
করেছি। অনেকগুলো
গল্প উপন্যাস পড়ার
পাশাপাশি প্রায়
শেষ করেছি পবিত্র
ধর্মগ্রন্থ 'আল কোরআনের
বাংলা মর্মবাণী' (আটাশ পারা পর্যন্ত
পড়া হয়েছে)। করোনা
প্রাকৃতিক দুর্যোগ - প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা
ব্যাহত হয়েছে
কিন্তু প্রকৃত
শিক্ষার সুযোগ
ছিল বা এখনো
আছে যা সম্ভব
ভালবেসে বই
পড়ার মাধ্যমে। আমরা
অপরাজনীতির বলি
হয়ে হারিয়েছিলাম সময়, কিন্তু প্রকৃত
শিক্ষা লাভে
আমাদের কোন
বন্ধুই পিছিয়ে
ছিল না। তাইতো
আমার সববন্ধুই পেশাগত
জীবনে সফল।
জীবনের সৌন্দর্য
উপভোগ করতে
হলে বই পড়তে
হবে, বই পড়ার
অভ্যাস থাকলে
আর কখনোই মনে
হবে না সময়
অপচয় হচ্ছে। সবার
জন্য শুভ কামনা
রইল।
মুহাম্মদ আলী আরশাদ চৌধুরী
সহযোগী অধ্যাপক
একাউন্টিং বিভাগ, চবি।
