কলকাতা ডার্বিঃ এমন এক ফুটবল দ্বৈরথ যার পেছনে কারন ছিল ফুটবল এর চেয়ে বেশি কিছু।
যদি আমরা বড় বড় ফুটবল ডার্বি নিয়ে আলোচনা করতে যাই আমাদের সবারই মাথায় আসে রিয়াল মাদ্রিদ বনাম অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ, আর্সেনাল বনাম টটেনহাম,ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বনাম ম্যানচেস্টার সিটি ইত্যাদি ডার্বির কথা।কিন্তু আমরা কি জানি যে আমাদেরই ভারতীয় উপমহাদেশেই এমন একটি ডার্বি আছে যেটা শতবর্ষেরও বেশি পুরনো? আমরা কি জানি এই ডার্বি টিকে এশিয়ার one of the fiercest football rivalry বলে মনে করা হয়? শুধু তাই নয়, এই ডার্বিটিকে ফিফার ক্লাসিক ডার্বি লিস্টএও ফিচার করা হয়েছে। হ্যাঁ, আজকে লিখতে যাচ্ছি সেই বিখ্যাত কলকাতা ডার্বি নিয়ে। মোহন বাগান বনাম ইস্টবেঙ্গল এর সেই ফুটবল ডার্বি নিয়ে, যে ডার্বির পেছনে রয়েছে ফুটবল থেকে বেশিকিছু।
এই দুই ক্লাব এর দ্বৈরথ এর কারণ বিশ্লেষণের আগে এই দুই ক্লাব এর প্রতিষ্ঠার ইতিহাস কিছুটা জেনে নেয়া যাক।প্রথমে আসা যাক মোহনবাগান এর ইতিহাসে। ১৮০০ সাল পরবর্তী সময়ে যখন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম ধীরে
ধীরে রুপ পাওয়া শুরু করে সেই সময়ে তৎকালীন কিছু ভারতীয় ফুটবলপ্রেমী এবং ইস্টার্ন
প্রভিঞ্চের কিছু লোক ১৮৮৯ সালে একটি ফুটবল ক্লাব গড়ে তোলে যার পেছনে অন্যতম বড় ব্যক্তি
ছিলেন সেখানকার এক স্থানীয় উকিল জনাব ভুপেন্দ্র নাথ বসু। তিনি এই ক্লাব এর প্রথম
প্রেসিডেন্টও ছিলেন। তখনকার বিখ্যাত ৩ অভিজাত পরিবার ছিল ক্লাবের পরিচালনার সাথে
জড়িত- বসু পরিবার, সেন পরিবার ও মিত্র পরিবার। ক্লাবটি প্রতিষ্ঠিত হয় অগাস্ট ১৮৮৯
সালে এবং এটি ছিল ভারতীয় ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন ক্লাব। ১৯৮৯ সালে ক্লাব এর
শতবর্ষ পূর্তিতে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী রাজীব গান্ধী ক্লাব টিকে
ভারতের জাতীয় ক্লাব হিসাবে ঘোষণা দেন। ১৯০০ সালের দিকে সুবেদার মেজর শৈলেন বসু ( highest ranking Indian
officer of 49th Bengal regiment) তিনি আসার পর খেলোয়াড়দের ফিটনেসের দিকেবেশি নজর দেন এবং এর ফলশ্রুতিতে ১৯০৪ সালে মোহনবাগান তার প্রথম শিরোপা কুচবিহার কাপ জয়লাভ করে। ১৯০৫ সালে তারা পুনরা য়কুচবিহার কাপ বিজয়ী হয় এবং এর পাশাপাশি তারা Gladstone কাপএও জয়লাভ করে। Gladstone কাপ ফাইনাল এ তাদের প্রতিপক্ষ ছিল তখনকার IFA Shield
বিজয়ীদল Dalhousie যাদেরকে মোহনবাগান ৬-১ গোলে পরাজিত করে।তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিজয় বলে মনে করা হয় ১৯১১ সালের IFA Shield জয়কে।মোহনবাগান এই টুর্নামেন্ট এ অংশ নেয়ার আগে এই টুর্নামেন্ট এ শুধু মাত্র ব্রিটিশ রেজিমেন্ট এর দলগুলোই অংশ নিতে পারত।১৯১১সালেমোহনবাগান IFA Shield এরফাইনালএইস্টইয়র্কশায়াররেজিমেন্টএরমুখোমুখিহয়এবংতাদেরকে২-১গোলেপরাজিতকরে।ওইম্যাচেইস্টইয়র্কশায়াররেজিমেন্টএরকাছেসবরকমেরফুটবলসরঞ্জামছিলকিন্তুমোহনবাগানসেইম্যাচেখালিপায়েমাঠেনামে।মোহনবাগানএরএই IFA Shield জয়শুধুফুটবলএরদিকথেকেইযেগুরুত্বপূর্ণছিলতানয়, এইবিজয়কেভারতীয়স্বাধীনতাসংগ্রামএরওএকটাগুরুত্বপূর্ণঅংশবলেমনেকরাহয়েথাকে।কারনএইবিজয়েরসময়ভারতীয়স্বাধীনতাসংগ্রামওধীরেধীরেবড়হওয়াশুরুহতেথাকে।
এবার আসা যাক ইস্টবেঙ্গল এর ইতিহাস নিয়ে।ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্রতিষ্ঠা হয় একটা মনোমালিন্য থেকে। জুলাই ২৮, ১৯২০ তারিখে মোহনবাগান বনাম জোরাবাগান এর মধ্যে একটি ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।সেই খেলায় জোরাবাগান ক্লাব এর অন্যতম সেরা খেলোয়াড় শৈলেশ বসু কে বেঞ্চ এ বসিয়ে রাখা হয়। জোরাবাগান ক্লাবের তৎকালীন ভাইস- প্রেসিডেন্ট সুরেশ চন্দ্র চৌধুরী শৈলেশ বসুকে
প্রথম একাদশ এ রাখতে অনুরোধ করেন। তার অনুরোধ সত্ত্বেও শৈলেশ বসুকে প্রথম একাদশে
স্থান দেয়া হয়নি। ম্যাচ এর পরপরই তিনি(সুরেশ) ক্লাবের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন
করে দেন। তার কিছুদিন পর তিনি(সুরেশ) ও আরও কয়েকজন একত্রিত হয়ে অগাস্ট ১,১৯২০ তারিখে
নতুন একটি ক্লাব গড়ে তুলেন যার নাম দেয়া
হয় ইস্ট বেঙ্গল। ক্লাব এর নাম ইস্ট বেঙ্গল রাখার কারন ছিল সুরেশ চৌধুরী সহ ক্লাব এর
প্রায় সব প্রতিষ্ঠাতা সদস্যই তৎকালীন ইস্ট বেঙ্গল(বর্তমান বাংলাদেশ) এর অধিবাসী
ছিলেন। ক্লাব টি প্রতিষ্ঠার প্রথম মাসেই তাদের প্রথম টুর্নামেন্ট এ অংশগ্রহন করে
যেটা ছিল একটা 6-a-side টুর্নামেন্টহারকিউলিসকাপ।ইস্টবেঙ্গলওইটুর্নামেন্টেজয়লাভকরেএবংওই
টুর্নামেন্ট এর পর ইস্ট বেঙ্গল IFA এরসাথেএফিলিয়েটেডহয়।এরপরক্লাবটি IFA এরদ্বিতীয়ডিভিশনেখেলারসুযোগপায়।প্রথমসিজনেক্লাবটিদ্বিতীয়ডিভিশনে৩য়স্থানদখলকরে।১৯২৪ সালে তারা দ্বিতীয় ডিভিশন থেকে প্রথম ডিভিশন
এ উন্নীত হওয়ার সুযোগ পায়।
মোহনবাগানওইস্টবেঙ্গলপ্রথমবারেরমতএকেঅপরেরমুখোমুখিহয়অগাস্ট৮, ১৯২১সালেকুচবিহারকাপসেমি ফাইনালে।তাদেরপ্রথমম্যাচগোলশূন্যড্রহয়ওদ্বিতীয়ম্যাচেমোহনবাগান৩-০গোলেজয়লাভকরে।যখনইস্টবেঙ্গলIFA এরপ্রথমডিভিশন IFA Shield এউন্নীতহয়তখনথেকেইমুলতএইমোহনবাগানএবংইস্টবেঙ্গলদ্বৈরথএরসুচনাহয়কারণদুইদলএকইহোমভেনুতেখেলত।
এই দ্বৈরথ এর মুল কারণে
আসলে এই ২ ক্লাব এর সমর্থকদের সাংস্কৃতিক ভিন্নতা। ১৯০৫ সালে যখন বঙ্গভঙ্গ হয়, তখন
পশ্চিম বাংলা থেকে অনেক মুসলমান পূর্ব বাংলায় চলে আসে। তেমনিভাবে পূর্ব বাংলা থেকে
অনেক হিন্দু পশ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতায় চলে যায়। একই ঘটনা ১৯৪৭ সালেও হয় যখন ভারত ও
পাকিস্তান ভাগ হয়। এই দুই ক্লাব এর সমর্থক বেইজ এর দিকে যদি দেখা হয় তাহলে দেখা
যাবে বেশির ভাগ মোহনবাগান সমর্থক পশ্চিমবঙ্গের আদি বাসিন্দা, (native Indians) এবংইস্টবেঙ্গলএরঅধিকাংশসমর্থকপূর্ববাংলা হতে
যাওয়া immigrant জনগোষ্ঠী।এটার পেছনে কারন বিশ্লেষণ এ যদি আমরা যাই তাহলে আমরা দেখতে
পাব ইস্ট বেঙ্গল ক্লাব এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য প্রায় সকলেই তৎকালীন পূর্ববাংলা
(বর্তমান বাংলাদেশ) এর অধিবাসী ছিলেন। হয়ত সেই সফট কর্নার থেকেই পূর্ববাংলার বেশির
ভাগ immigrant জনগোষ্ঠীর সমর্থন পেয়ে আসছে এই দলটি।
এর পাশাপাশি স্পোর্টিং স্পিরিট এবং একে অপরের চেয়ে ভাল করার প্রতিযোগিতা তো আছেই।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গ
হচ্ছে ভারতের সেই সব অঞ্চল গুলো একটা যেখানের মানুষজন প্রচুর পরিমাণের ফুটবলপ্রেমী। আমরা যদি এই অঞ্চলের মানুষদের
ফুটবলপ্রেমী হওয়ার কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করি তাহলে যেই জিনিসটা উঠে আসবে সেটা
হচ্ছে এই অঞ্চলের ক্লাব মোহনবাগানই প্রথম ভারতীয় দল হিসেবে IFA Shield জয়করে। তাদের এই জয়ের সময় উপমহাদেশে ব্রিটিশদের রাজত্ব ছিল এবং এই এলাকার মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রামের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।এই সময়ে ব্রিটিশ দলগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা করে তাদেরকে পেছনে ফেলে মোহনবাগান এর IFA Shield বিজয় অনেক বড় একটি ঘটনা ছিল এবং এই বিজয়কে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামেরও একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করা হয়ে থাকে।এই কারনেই মুলত এই অঞ্চলের মানুষরা অনেক বেশি ফুটবলপ্রেমী এবং মোহনবাগান ক্লাবের
সবচেয়ে বড় সমর্থক।
এই দুই দলের
মুখোমুখি দেখায় সব ধরনের খেলা মিলিয়ে ম্যাচ হয় ৩৭০ টি (competition+ friendly) যার মধ্যে ইস্ট বেঙ্গল জয়ী হয় ১২৯ খেলায় এবং মোহনবাগান এর জয় ১২০ টি। (ড্র ১২১) দুই
দলের খেলায় সবচেয়ে বড় ব্যবধান এর জয় ও ইস্ট বেঙ্গল এর ই (৫-০ গোল, ১৯৭৫ IFA
Shield ফাইনাল )। এই দুই দলের সবচেয়ে
উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচ হয় ১৯৯৭ সালের ফেডারেশন কাপ সেমি ফাইনাল এ যেখানে তৎকালীন
এশিয়ান রেকর্ড উপস্থিতি ১৩১০০০ জনমানুষ মাঠের এই দ্বৈরথে রসাক্ষী হয়। সেই খেলায় ইস্ট বেঙ্গল ৪-১ গোলে জয়লাভ করে। দুই দলের সর্বশেষ দেখা হয় ১৯জানুয়ারী, ২০২০এ যেই খেলায় মোহনবাগান ২-১ গোলে জয়লাভ করে।
মোহনবাগান ও ইস্ট
বেঙ্গল ক্লাব এর এত সফলতার পিছনে এই দুই দলের এই দ্বৈরথের ভুমিকা অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ। যদি এই দ্বৈরথ না থাকতো হয়ত এই দুই ক্লাব সফলতার উচ্চ শিখরে
অধিষ্ঠিত হতে পারত না।
সোমেন দে
সেশনঃ ২০১৪-১৫
ডিপার্টমেন্ট অফ ম্যানেজমেন্ট
