07 November, 2020

করোনার প্রতিষেধক ও আমাদের ঔষধ শিল্প সমাচারঃ দীপ্ত সেন


 

করোনার প্রতিষেধক ও আমাদের ঔষধ শিল্প সমাচার


"বিনামেঘেবজ্রপাত" বাংলায় একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ। ১ জুলাই গ্লোব বায়োটেকের করোনার ঔষধ তৈরির ঘোষণাকে আর কিভাবেই বা বর্ণণা দিই!! সারা বিশ্ব যেখানে খড়ের গাদায় সুঁই খোঁজার মতোই করোনার ঔষধ হন্যে হয়ে খুঁজছে, সেখানে আমাদের মত দেশের একটি প্রতিষ্ঠানের ঘোষণাটা চমকপ্রদব টেই। বরাবরের মতই আমরা দুইভাগে বিভক্ত হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তর্ক-বিতর্ক নিয়ে মেতে উঠেছি।এই সুযোগে আসুন একটু না হয় জেনেই নেই বাংলাদেশের ঔষধ শিল্প আর করোনা প্রতিষেধক আবিষ্কারের সম্ভাবনা নিয়ে।।

বাংলাদেশের ঔষধ শিল্পের বিকাশ আপনাকে অতি অবশ্যই গর্বিত করবে। লিস্ট ডেভলপমেন্ট কান্ট্রি (LDC) এর তালিকাভুক্ত দেশ গুলোর মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশেরই রয়েছে ঔষধ শিল্পের দৃঢ় অবকাঠামো আর রপ্তানির সক্ষমতা। তবে আমাদের ঔষধ শিল্পের ইতিহাস বেশ বিবর্ণ। পাকিস্তান আমলে মোট চাহিদার মাত্র বিশ ভাগ ঔষধ তৈরি করার সক্ষমতা ছিল আমাদের। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শুরুতে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এদেশে ঔষধ বিক্রির আগ্রহই দেখায়নি, পরবর্তীতে পাটের বিনিময়ে পূর্ব ইউরোপের হাঙ্গেরির ওষুধ সংস্থা ইগিস, গেইডেন, রিখটার, কাইরন ও মেডিম্পেস ঔষধ সরবরাহে রাজি হয়। ১৯৮২ সালের ঔষধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ অক্সিজেন যোগায় দেশীয় ঔষধ শিল্পকে। বিশেষত গত তিন দশকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে ঔষধ শিল্প। বর্তমানে দেশের চাহিদার ৯৮ ভাগ যোগানদাতা দেশীয় ঔষধ কোম্পানীগুলো। আর রপ্তানি?? রপ্তানীকৃত দেশের সংখ্যা ১৬০ টি আর টাকার হিসেবে তা ২২০০ কোটি টাকার বেশি। ২৬৯ টি এলোপ্যাথিক ঔষধ তৈরিকারী প্রতিষ্ঠান (দেশীয় ও বহুজাতিক) বর্তমানে ১০৮১টি জেনেরিকের অধীনে আনুমানিক ১৯,৮৩০টি বিভিন্ন ব্রান্ডের ঔষধ তৈরি করছে। এবার দেখা যাক মুদ্রার উল্টোপিঠ। বাংলাদেশের প্রায় সব ঔষধ মূলত অন্যদেশের উদ্ভাবিত। বাংলাদেশের বিশেষায়ণ মূলত জেনেরিক ঔষধ (Generic Medicine) তৈরিতে। এবার জানা দরকার জেনেরিক ঔষধ কী? জেনেরিক ঔষধ হচ্ছে কোন প্যাটেন্টেড ঔষধের কপি, যেটাতে এক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (প্রধান উপাদান) একই রেখে অনান্য উপাদান,সাইজ, আকার এসবে পরিবর্তন করা হয়। কোন ডাক্তার যদি তার প্রেসক্রিপশনে ঔষধের জেনেরিক নাম লিখেন এর মানে তিনি ঔষধের মূল উপাদানটি লিখেছেন। রোগী  এক্ষেত্রে একই কম্পজিশনে তৈরী যেকোন ব্র্যান্ডের ঔষধ নিতে পারেন। একটা উদাহরণ দেয়া যাক, এজিথ্রোমাইসিন একটি জনপ্রিয় এন্টিবায়োটিক ঔষধের জেনেরিক নাম। বাংলাদেশে রেডিয়েন্ট Acos ব্র্যান্ড নাম, অপসোনিন Azicin নাম, স্কয়ার Zimax নাম এবং আরো অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন নাম ব্যবহার করে এর বিভিন্ন জেনেরিক বিকল্প বাজারজাত করে। কোন ঔষধ আবিষ্কারের ২০ বছর পেরিয়ে গেলে মেধাস্বত্ব খরচ ছাড়া এমন জেনেরিক বিকল্প তৈরি করা যায়। কিন্তু এলডিসি ভুক্ত দেশগুলোর জন্য ২০৩৩ সাল পর্যন্ত রয়েছে মেধাস্বত্ব ছাড় সুবিধা। এলডিসির তালিকায় থাকায় বাংলাদেশ কোন প্যাটেন্টেড ঔষধ ২০ বছর পূরণের আগেই কোনরকম মেধাস্বত্ব ফি ছাড়াই তা উৎপাদনেরসুবিধাপায়।এইযেমনকিছুদিনআগেইতৈরিএসকেএফতৈরিকরলোজেনেরিকরেমডেসিভির।২০২৪সালনাগাদবাংলাদেশআরথাকবেনাLDC তালিকায় এরপর থেকে নতুন ঔষধ তৈরি করতে হলে লাগবে মেধাস্বত্ব ফি। যদিও ৪১ টির মত এক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট দেশে উৎপাদিতহয়, তারপরও অনান্য শিল্পের মত ঔষধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানি নির্ভর। মুন্সীগঞ্জে গজারিয়ায় ৩৮১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মীয়মাণ এক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট শিল্প পার্ক প্রকল্প চলছে একযুগ ধরে। নেই বায়োইকুয়ভ্যালেন্স টেস্টের মাধ্যমে মূল ব্র্যান্ডের ঔষধের গুণগতমান জেনেরিক ঔষধে বজায় আছে কিনা তা জানার সুযোগও। সোজা কথায় ঔষধ শিল্পের সামনে এখন বিশাল চ্যালেঞ্জ।

এবার আসা যাক গ্লোব বায়োটেকের এর ব্যাপারে। দখলকৃত বাজার বিবেচনায় গ্লোব বায়োটেক বাংলাদেশের শীর্ষ স্থানীয় কোন ঔষধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান না।  তবে তারা এদেশে ব্যবসা করছে ১৯৮৬ থেকে। ঔষধের প্রি-ক্লিনিক্যাল ও বায়োলজিক্যাল ট্রায়াল করার জন্য ২০১৭ সালে ৩ টি ও ২০১৮ সালে ৬ টি স্থাপনা তৈরি করে গ্লোব, রয়েছে বায়োলজিক্স, নভেল ড্রাগ ও বায়োসিমিলার উৎপাদনেরজন্যনির্মিতগবেষণাগার।দেশেরশীর্ষস্থানীয়ঔষধপ্রস্তুকারকরাযখনজেনেরিকমেডিসিনতৈরীতেব্যস্ততখনগ্লোবেরএইউদ্যোগপ্রশংসাপেতেইপারে।ঔষধতৈরীমুখেরকথানয়দরকারপড়েজিনোমসিকোয়েন্সিংএরমাধ্যমে জিনের একটি অংশ কেটে নিয়ে তার ওপর পরীক্ষার, আরো দরকার পড়ে   একাধিক প্রাণীদেহে পরীক্ষার। ঔষধ তৈরীর জন্য পেরিয়ে আসতে হয় বেশ কয়েকটা ধাপ। ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন অনুযায়ী পুরো প্রক্রিয়াকে ৫ ভাগে ভাগ করা যায়।

1. Discovery and Development

2. Preclinical Research

3. Clinical Research

4. Review

5. Post market safety monitoring

গ্লোবের ঔষধটি এখনো প্রি-ক্লিনিক্যাল ধাপে। সামনে ক্লিনিক্যাল রিসার্চের চ্যালেঞ্জ, যা এই প্রক্রিয়ার সবচে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ক্লিনিক্যাল রিসার্চে বেশ কয়েক দফায় কয়েক দল মানুষের শরীরে প্রবেশ করিয়ে ঔষধ টির প্রভাব পরীক্ষা হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে ৬ মাসে গ্লোবের ঔষধটি বাজারে আনার আশাবাদ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট এর প্রধান ড. আসিফ মাহমুদের।মোট চারটি ক্যান্ডিডেট এবং তিনটি ডিফারেন্ট ডেলিভারি মেকানিজম নিয়ে কাজ করাটা যোগান দিচ্ছে আত্নবিশ্বাসের আগুন।

গ্লোব কি সফল হবে?? বলা মুশকিল। এক্ষেত্রে একটা বড় সমস্যা অনভিজ্ঞতা। কিন্তু একটা কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, আমাদের ঔষধ শিল্পে এটা একটা বড় পদক্ষেপ। ২০১৫ সালে যখন স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মেধাস্বত্ব ছাড় ২০৩৩ পর্যন্ত বাড়ালো, তখন অনেক পত্রিকায় এসেছিল ঔষধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান গুলোর নতুন ঔষধ তৈরীর বিনিয়োগে অনীহার চিত্র। যদি গ্লোব ব্যর্থও হয় ২০২৪ এর পর ঔষধ শিল্পকে টিকে থাকতে বড় অনুপ্রেরণা দেবে ড. আসিফ মাহমুদ ও তার সহকর্মীরা। 

কেউ তো অন্তত চেষ্টা করলো নতুন শুরুর, আসুন সবাই তাঁদের সমর্থন জানাই।।


দীপ্ত সেন

সেশনঃ ২০১৪-১৫

ডিপার্টমেন্ট অফ ম্যানেজমেন্ট