ডিলিউশন
বাচ্চাদের মত গুটিগুটি পায়ে হেঁটে মোহাম্মদ মতিন তার মেয়ের রুমে এসে দাঁড়িয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। মেয়ের কানে হেডফোন, এত জোরে ইংরেজি একটা গান বাজছে তিনি সামনে দাঁড়িয়েই শুনতে পারছেন। ল্যাপটপে ঘুটুরঘুটুর কী করে যাচ্ছে তা কিছুক্ষণ অবাক হয়ে দেখলেন মোহাম্মদ মতিন। মেয়েকে ডাকতেও দ্বিধায় ছিলেন। কী না কী বলে বসে সে আবার। শেষমেশ কাঁচুমাচু হয়ে ডাকতে লাগলেন, "মাইশা? এই মাইশা?" মাইশা ভ্রু কুঁচকে হেডফোন তুলে তাকালে তিনি বলেন, "আমার একজন ক্লায়েন্ট নাকি আমাকে কিছু দলিল দিবে, আমার ইন্টারনেটে একটু দেখে দাও তো?" মাইশা ঘুরে বলল,"ইন্টারনেট মানে?! এতবার শেখানোর পরেও তোমার মনে থাকে না কেন? কোন্ সোশাল মিডিয়ায় কোন্ জায়গায় দিবে এটা নিশ্চয়ই বলেছে। তুমি এখনো পর্যন্ত বলতে পারো না এসব!" মতিন সাহেবের বিব্রত মুখ দেখে মাইশা বলতে লাগলো আবার, "এটা কী ইমেইলে দিয়েছে?" তাঁর মুখ উজ্জ্বল হলো এবং তাড়াতাড়ি মাথা দুলিয়ে বললেন, "হ্যাঁ হ্যাঁ জিমেইলে দিয়েছে! মনে পড়েছে।" "তো? তোমার ল্যাপটপে দেখো না, ওখানে G-mail লেখা একটা খামের ছবিওয়ালা আইকন উপরেই pin করে রাখা। শেখালাম না তোমাকে? আর কতবার বলা যায়?" কথাগুলো মোহাম্মদ মতিনের মাথার উপর দিয়ে চলে গেলো, "ল্যাপটপ সেটা তো অনেক সমস্যা করে ৷কী এক লেখা আসে: “This version might not work” হেনতেন। আমি কিছুই বুঝি না, কীভাবে করব এটা?" মুখে বিরক্তি নিয়ে মাইশা তার বাবার সাথে গেলো, কিছুক্ষণ ঘাটাঘাটি করে বললো, "এটা তো ভাইরাস নিয়ে বসে আছে। Antivirus installation লাগবে। এই তোমার মত মানুষগুলোকে ল্যাপটপ ধরতে দেওয়া উচিত না এজন্য! যা-ও ভাঙাচোরা একটা ল্যাপটপ দিলাম, সেটার যা তা অবস্থা করলে, যেই সেই লিংক মেইলে পেলে ঢুকে যাও।" মোহাম্মদ মতিন থতমত খেয়ে আমতা আমতা করে কথা বলতে লাগলেন। মাইশা তার অপেক্ষা না করে বললো, "দেখো, এতকিছু করার সময় নাই আমার, আপাতত তুমি ল্যাপটপ ধরিও না, অন্যান্য কাজ করো বসে। কতকিছুই করার আছে।" "কিন্তু, ইয়ে মেইলটা, তোর ল্যাপটপ থেকে দেখা যাবে না? আমি ঐ ক্লায়েন্টকে আমার ইমেইল দিয়েছিলাম: mdmotin1952 a com." মাইশা আরো বিরক্ত হয়ে বলে উঠল, "mdmotin1952 at gmail dot com! এরকম ভুলভাল বলতে থাকো সবার সামনে তুমি! তারপর মানুষ হাসুক তোমার কথা শুনে!" মোহাম্মদ মতিন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বললেন "তুমি উনাকে একটু কল করে আমার মেইলটা সুন্দরমত জানাতে পারবে? মেইল দিতে পারে নাই মনে হয়, আমি তো ভুল বলে দিলাম। তারপর একটু চেক করিও ল্যাপটপে?" মাইশার সেদিকে খেয়াল নাই, সে মোহাম্মদ মতিনের ফেসবুক প্রোফাইলে ঢুকে চোখ কুঁচকে আছে, "আব্বা, এসব কী? তুমি উল্টাপাল্টা পোস্টে কেন কমেন্ট করতে যাও? আশ্চর্য কতবার বোঝাবো, ব্যবহার করতে জানোনা, তো কেন ফেসবুক খুলতে বলেছিলে ভাইয়াকে তোমার জন্য? কন্টেন্ট চিনো না। যার-তার ফালতু পোস্ট শেয়ার করতে আছো।” “এগুলো তো আমি করি নাই! কেমন করে জানি হয়ে যায় আমার!" মাইশার রাগান্বিত চোখে তাকানো দেখে, তিনি ভড়কে গেলেন। "হ্যাঁ! এমনি এমনি শেয়ার হয়ে যায় তোমার, যেখানে সেখানে রিঅ্যাক্ট হয়ে যায় এমনি এমনি! তুমি তো করো না। যত্তসব!" মাইশা বিরক্তি নিয়ে উঠে তার রুমে চলে গেল। একটু পর সেখান থেকে তার হাসিমাখা কথার আওয়াজ শোনা গেলো, সম্ভবত বন্ধুরা ছিল অপর পাশে। হেসে হেসে সে বলতে থাকলো তার বাবার কান্ডকারখানাগুলো, "বেকুবের মত কাজ করে! পারব না আর আমি, মানুষ হাসুক এগুলো দেখে!"মোহাম্মদ মতিন মুখ মলিন করে ঘরে হাঁটতে লাগলেন। মাইশার মা নামাজ পড়ছেন অন্যরুমে। তাই তিনি তাঁর ভাঙাচোড়া হ্যাং হয়ে থাকা ল্যাপটপের সামনে এসে বসলেন, এক মনে দেখছেন এত রংচঙে সব আইকন, পোস্ট, ছবি। কত জটিল লাগছে তাঁর কাছে এসব। হঠাৎ মনে হল, রিঅ্যাকশনগুলো, ইমোজিগুলো চোখের সামনে লাফালাফি করছে জোনাকির মত আর তাঁকে যেন "বেকুব" বলে ডেকে বেড়াচ্ছে। ছবির মানুষগুলো হঠাৎ জীবন্ত হয়ে যেন তাঁকে বলতে লাগলেন, "মতিন সাহেব এত আনকালচারড হলে কী করে টিকবেন এ দুনিয়ায়?" চোখ জোরসে মুদে ল্যাপটপ বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে পড়লেন তিনি। বড় বড় নিঃশ্বাস নিচ্ছেন আর ভাবতে লাগলেন উদ্ভট কিছু কল্পনা, ইতিবাচক কিছু কল্পনা – একসময় মো. মতিন চুলবুল করে ল্যাপটপ চালানো শিখে গেলেন, পিয়ানোর মত তিড়িংবিড়িং করে ল্যাপটপ চালাচ্ছেন। যেন এটি কোনো এক বাদ্যযন্ত্র! কীবোর্ডের উপর তাঁর হাতের স্পর্শে একটা সংগীত রচনা হয়ে যাচ্ছে সেখানে। সামনে বিশাল জনস্রোত আর তাদের মুখে উজ্জ্বল মুগ্ধকর হাসি। তাঁকে “সেরা ল্যাপটপ ব্যবহারকারী” হিসেবে পুরষ্কৃত করতে করতালি দিয়ে মঞ্চে উঠছেন বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, উপস্থাপক একজন ভরাট হাসি নিয়ে তাঁর হাত ধরে করমর্দন করেই যাচ্ছেন এবং আনন্দিত গলায় বলে উঠলেন, "Mr. Motin! No one plays the laptop better than you!"
আরশি ইরতিজা
সেশনঃ ১৭-১৮
ডিপার্টমেন্ট অফ হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট
