নীলুর সন্ধ্যা
জং ধরা জানলার গ্রীল শক্ত করে দু হাতের মুঠোয় ধরে থাকে নীলু। শেষ বিকেলের লালচে আকাশ দেখছে তার চোখ। অন্যদিন আকাশের সাথে নিজের নামের মিল খুঁজে পায় সে। আজ পাচ্ছেনা। আকাশের থেকে চোখ নামিয়ে নেয় ও ৷ উঠোনের মাঝখানে ইবু তার কবুতরগুলোকে গমের দানা খাওয়াচ্ছে। এবার ক্লাস এইটে উঠেছে। স্কুলে যেতে হয় বলে সে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে যায়। পড়াশোনার তেমন ইচ্ছে নেই তার। কবুতর আর তার বড় ভাই সফিকের পুরনো সাইকেলটাই তার জগৎ। ইবুর সাতটা কবুতর। তিনটে জোরা বেধেঁছে আর একটা আলাদা। সাত নম্বর কবুতরটিকে নীলু কখনো অন্য কবুতরদের সাথে ঘেষতে দেখেনি। এখনো ছয়টি কবুতর ইবুর হাত থেকে গমের দানা খাচ্ছে আর ঐটি নিচে পরে থাকা দানা খুটে খুটে খাচ্ছে।
এই ইবু এই, জানালার বাইরে হাত নাড়িয়ে নীলু ইবুকে ডাকলো।
ইবু সাত নম্বর কবুতরটিকে হাতে নিয়ে জানালার ধার ঘেষে দাঁড়ালো।
তার ডান চোয়ালে কালশিটে দাগ পরেছে, বুকপকেট ছেড়া। হাটুর দিকটা ছিলেছে ভালোই।
ফের মারামারি করেছিস?
ইবু কপাল জরো করে নীলুর দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। কবুতরের গায়ে হাত বোলায় কয়েকবার। ইবু কারো প্রশ্নেরই তেমন জবাব দেয়না। কখনো কখনো কপাল জরো করে তাকায়, আবার কখনো হ্যা না উত্তর দেয়।
তোর ভাই কবে আসবেরে?
জানিনা, কবুতরের গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে উত্তর দেয় ইবু।
কথা হয়না তোর সাথে?
হয়।
জিজ্ঞেস করিস নি তুই?
না।
তিনিও কিছু বলেননি?
না। আমি যাই।
এই দাঁড়া। শাড়িতে আমাকে কেমন লাগছে?
আবারো কপাল জরো করে তাকায় ইবু। কবুতর হাতে যেভাবে এসেছিলো সেভাবে চলে যায় সে।
তুই তোর ভাইয়ের থেকেও খারাপ।
নীলুর কথাটা ইবু হয়তো শুনতে পায়নি। ফিরে গিয়ে আবার কবুতরগুলোকে গমের দানা খাওয়াতে লাগলো।
নীলুকে আজ দেখতে এসেছিলো। পাত্র সবার পছন্দ হয়েছে। নীলুর বড় মামা দেলোয়ার সাহেব সম্বন্ধটা এনেছিলেন। ছেলে খারদিয়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক হাসান সাহেব। হাসান সাহেবকে খারাপ লাগেনি নীলুর। একটা লাজুক লাজুক ভাব আছে। আনমনে হেসে ফেললো নীলু। অথচ তার একটুও লজ্জা করছিলোনা। বড় মামা যখন তাদের দুজনকে কিছুক্ষণ একা কথা বলতে দেয়ার জন্য বাবাকে নিয়ে বসার ঘর থেকে উঠে গেলেন হাসান সাহেব বলেছিলেন, আপনাকে কাজল দিলে খুব সুন্দর লাগে।
নীলু হেসে ফেলেছিলো। পরক্ষণেই তার মনে হলো একদম ঠিক হয়নি। এরপরের দশমিনিট কেউই কোনো কথা বললোনা। নীলুরও এভাবে বসে থাকতে অস্বস্তি লাগছিলো। বড় মামা এসে যেন দুজনেকেই বাঁচালেন।
নীলু বিছানায় উঠে পা গুটিয়ে বসলো। পাশে রাখা আয়নাটা হাতে নিয়ে নিজেকে দেখলো। কি মনে করে তার শাড়ির সবুজ আঁচলটা টেনে চোখের কাজল ঘষে তুলে ফেললো। নতুন শাড়িতে কালি লেগে গেছে বলে নীলুর কিছুই হলোনা, অন্যসময় হলে চোখে পানি আসতো তার। অল্পতেই নীলুর চোখে পানি আসে। পেছন ঘুরে বিছানার সাথে দেয়ালে ঝুলানো ক্যালেন্ডারের আজকের তারিখটা লাল সাইনপেনে গোল করলো। আজ নিয়ে দুই মাস তিন দিন শফিক ভাই বাড়িতে নেই। তাদের শেষ দেখা হয়েছিলো সাত এপ্রিল। সেদিন নীলুর বান্ধবী তিথির জন্মদিন ছিলো। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে ও ভাবেনি। পথ চলতে একটু ভয় ভয়ই করছিলো ওর। হঠাৎ দেখতে পায় সামনে শফিক ভাই আসছে। কাছে আসতেই শফিক হড়বড় করে বলতে লাগলো, তোর মা বললো একটু এগিয়ে নিয়ে আসতে। তোর বাবাতো শহরে তাই আমিই।
এতটুকু বলেই থেমে গিয়েছিলো শফিক। এই প্রথম নীলু এতোক্ষন শফিকের চোখে চোখ রেখে তাকিয়েছিলো। চোখ নামিয়ে ধাতস্থ হয়ে চলতে শুরু করলো নীলু। কেউ কারো সাথে আর কোনো কথা বললোনা। শুধু পথের ধারে একদল ঝিঝি পোকা একঘেয়ে সুরে কি বলে গেলো তারাই জানে।
শফিক ভাইকে কেমন ভয় ভয় লাগে নীলুর। বাসায় তাকে তেমন দেখাই যায়না। মাঝে মাঝে শফিক ভাইয়ের মায়ের সাথে গল্প করতে গিয়ে দেখেছে শফিক টান হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। এক হাত কপালের ওপর ভাঁজ করে রাখা। একদিন দেখেছে শফিকভাই বিছানায় বসে একটা বই পড়ছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষের কবিতা। পড়ছে আর মাাঝে মাঝে কপাল জরো করে ফেলছে।
ফিক করে হেসে দেয় নীলু। আস্তে করে মাথা নেড়ে বলে, দুই ভাইয়ের এক স্বভাব।
পরের তিনদিনের মধ্যে নীলু কলেজের লাইব্রেরি থেকে শেষের কবিতা বই নিয়ে এসে পড়ে শেষ করে। পরদিন সে শফিকের ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়। চেয়ারে বসে টেবিলের ওপর ঝুঁকে একটা ডায়েরিতে কিছু লিখছিলো শফিক। নীলুর সাড়া পেয়ে খট করে ডায়েরি বন্ধ করলো সে। নীলু একটু সামনে গিয়ে মাথা নিচু করে জিজ্ঞেস করে, বইটা কেমন লাগলো?
শফিক নীলুর দিকে না তাকিয়েই বললো, কোন বই?
ঐ যে শেষের কবিতা।
পুরোটা পড়িনি।
কেনো?
সফিক এবার নীলুর দিকে তাকিয়েই জবাব দিলো, ইচ্ছে হয়নি।
নীলু দৌড়ে নিজের ঘরে চলে আসে। সে চায়নি সফিকভাই তার চোখের পানি দেখে ফেলুক।সেদিন ও দরজা বন্ধ করে দিয়ে পুরো বিকেলে বিছানায় শুয়ে থাকে।
নীলুর ঘুম ভাঙে সন্ধ্যারো অনেক পরে। চোখ খুলে বুঝতে পারে ও শফিক ভাইয়ের ভঙ্গিতে শুয়ে ছিলো। এক হাত কপালের ওপর ভাঁজ করা। নীলু উঠে বসলো। তার চোখ জ্বলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে জ্বর আসছে। প্রচন্ড জ্বর।
নীলুর মা ঘরে এসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে হাতটা চুমু খেয়ে বললেন, আগামী শুক্রবার তোর বিয়ে। বল আলহামদুলিল্লাহ।
নীলু আস্তে করে বলে, আলহামদুলিল্লাহ।
নীলুর মা যেভাবে হন্তদন্ত হয়ে এসেছিলেন সেই গতিতেই ফিরে গেলেন। নীলুর মনে হলো, মা তার মাথায় হাত রেখে কি বুঝলোনা তার গায়ে কি প্রচন্ড জ্বর৷ নাকি সব ঠিকই আছে। শুধু নীলুরই মনে হচ্ছে তার গায়ে জ্বর। এই জ্বর অন্য কেউ বুঝবেনা ।
পরদিন ফজরের আযানে ঘুম ভাঙে নীলুর। বিছানা থেকে নেমে বুঝতে পারে রাতের সেই খারাপ লাগাটা আর নেই। এখন বেশ হালকা লাগছে। কলঘরে গিয়ে ওজু করে নেয় সে। ঘরে এসে নামাজের পাটি বিছিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করে। মোনাজাত শেষ করে পাটি গোটাতে গিয়ে কি মনে করে আবার মোনাজাত ধরে। বিরবির করে বলে, আল্লাহ শফিকভাই যেন খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসে। খুব তাড়াতাড়ি। মোনাজাত শেষ করে খুব দ্রুত পাটি ভাজ করে ঘর থেকে বেরোয় সে। নীলুর মনে হতে থাকে তার ঘরে কেউ শুনে ফেলেছে তার কথা।
শফিক ভাই যেন তাড়াতাড়ি ফিরে আসে। খুব তাড়াতাড়ি।
নীলুর ভেতর ঢিপ ঢিপ করে একই কথা বাজতে থাকে। খুব ভয় হতে থাকে ওর। কেউ যদি শুনে ফেলে। নীলু আবার নিজের ঘরে ফিরে আসে। দরজা বন্ধ করে দেয়। বিছানায় হেলান দিয়ে মেঝেতে বসে থাকে ও। ওর চোখ সিলিং এ ঝোলানো অনবরত ঘুরতে থাকা ফ্যানের দিকে। ফ্যানের ক্যাচ ক্যাচ শব্দে ওর ভেতরের শব্দ চাপা পরতে থাকে। ভয় কমে যায় নীলুর।
জানালা খুলে দেয় ও। উঠোনের মাঝে সেই সাত নম্বর কবুতরটা একা। খাবার খুঁজছে হয়তো। চারিদিকে কোনো গমের দানা নেই।
আজ শুক্রবার। বাদ মাগরিব নীলুর বিয়ে হয়ে গেলো হাসান সাহেবের সাথে। হঠাৎ ওর বাম হাতের ওপর একটা হাতের ছোঁয়া পেলো নীলু। হাসান সাহেব নীলুর হাত ধরেছে। নীলু চমকে উঠলো ঠিক যেভাবে সেদিন রাতে শফিকভাইকে দেখে চমকে উঠেছিলো। নীলুর চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে এলো। একদল আলোক রশ্মি তীব্রভাবে ওর চোখের ওপর পরলো। নীলুর মনে হচ্ছে শফিকভাই ওর সামনে দাঁড়িয়ে। এখনি হড়বড় করে সব বলবে কেনো দেরি করে এসেছে। নীলুর চোখে যন্ত্রণা হচ্ছে। তবুও সে তাকিয়ে আছে। সে চায় শফিকভাই কিছু বলুক। শফিক কিছু বলেনা কেবল চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
Fatema Tuzzohora
Department of Human Resource Management
