বিয়ের দিন
শুক্রবার,
আজ আমার বোনের বিয়ে। অন্যসব বিয়ের মতো স্বাভাবিক বিয়ে না, আবার যদি বলি বিয়ে তো বিয়েই তাহলে অস্বাভাবিকও না।
স্বাভাবিক বিয়ে হলে এখন হয়তো এসব নিয়ে লিখার সুযোগ পেতাম না। কত্তো কাজ থাকতো আমার। এক মাস আগে থেকে আয়োজন হতো। কেনাকাটা, বিয়ের কার্ড দিতে একেকজনের বাড়িতে যাওয়া, চিনি না জানি না এমন কতো মানুষকে যে দাওয়াত দিতে হতো। ডেকোরেশনের কাজ, বউ সাজানোর কাজ, খাওয়া দাওয়ার আইটেম আর অন্যান্য সব কিছু কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই ঠিক করে রাখতে হতো। একসপ্তাহ আগে থেকে হতো বাড়ি সাজানো ; মরিচবাতি, রঙবেরঙের চাইনিজ ল্যাম্পগুলো দিয়ে গেইট ও রাস্তা সাজানো থাকতো। সন্ধ্যা হলেই জ্বলজ্বল করে সব আলোকিত হয়ে উঠতো। তিন চারদিন আগে থেকে নিকটাত্মীয়দের আনাগোনা শুরু হতো। দূর থেকে যারা আসতো তারা বিয়ের আগে কয়দিন এখানেই থাকতো। গতকাল হয়তো গায়ে হলুদ হতো। এখন তো আবার হলুদ ছোঁয়া, হলুদ সন্ধ্যা, হালদি নাইট কতকিছু বলে। গায়ে হলুদে অনেক হৈহুল্লোর গানবাজনা নাচানাচি হতো মধ্যরাত পর্যন্ত।
কিন্তু যখনই ঘুমাই না কেন, আমার উঠতে হতো সকাল সকাল। কতো কাজ, সব দেখাশোনা তদারকি করা। বাড়ির বড় ছেলে হিসেবে সব আমারই করা লাগতো। আব্বা একা আর কি করতো। বয়সও তো হয়েছে আর উনি তো আত্মীয়দের সাথে, মুরুব্বিদের সাথে আড্ডা দিয়েই সময় পেতো না। ছোট ভাই টা তো ছোটই। সকাল থেকে থাকতাম মহাব্যস্ত। কাজের ফাকে কোনরকম দুচারটা খেয়ে গোসল করে রেডি হয়ে নিতাম। সাজগোজ কতদূর হলো সেই নিয়ে তদারকি করতাম, তাড়া দিতাম। শুক্রবার তো এমনিই সময় চলে যায়, দুপুর হয়ে যায় কোন ফাকে বোঝাই যায় না। বরপক্ষ আসলে তাদের আপ্যায়ন করে নেওয়া, বর ঢোকার আগে গেইট ধরা, গেইটে ধরে টাকা নেওয়ার ট্রেন্ড ফলো করা সবই হতো। তারপর বিয়ে, বিয়ে পড়ানো হয়ে গেলেই সবার খাওয়ার ব্যবস্থাও আমাকে করতে হতো । অবশ্য ব্যবস্থা তো করাই থাকতো আমি শুধু একটু তদারকি করতাম। খাওয়া দাওয়া শেষে সবাই একে একে চলে যেতো। সাথে বরপক্ষ বউ কে নিয়ে রওনা দিতো আর....
আমি একাই কতো কিছু বলে যাচ্ছি, আব্বার আম্মার ও তো কিছু বলার থাকতে পারে। আর ছোট ভাইটার? ওর ও হয়তো অনেক প্ল্যানিং ছিলো। থাকতেই পারে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে শুয়ে ছিলাম বেশকিছুক্ষন। উঠে খেয়ে কেবল বসেছি বই নিয়ে। পড়াশোনা কিচ্ছু হচ্ছে না, ভাবছিলাম আজকে শুরু করবো পড়া। ফোন হাতে নিয়ে নীলুকে কয়েকটা টেক্সট পাঠালাম।
আর, টুক করে কয়টা মেসেজ আসলো ।
আমার বোনের মেসেজ, সে আজ বিয়ে করছে, বৌ সেজেছে সেই ছবি দিয়েছে।
বিয়ে করছে অন্যধর্মের একজন কে। বললো তাদের জন্য দোয়া করতে।
সুন্দর লাগছে অনেক। আম্মা দেখলে অনেক খুশি হতো, আব্বাও।
বন্ধুর বোনের বিয়েতে কতো আনন্দ করেছি, কতো ছবি তুলেছি। কতো আত্মীয়র বিয়েতে গিয়েছি। কতো কাজিনের বিয়েতে কতো কিছু করেছি। আর আজ আমার বোনের বিয়ে, সাথেই নেই আমি। বউ সেজে থাকা আমার বোনের সাথে আমার কোনো ছবি নেই। আব্বা আম্মা মন ভরে দেখছে না, দোয়া করছে না। একা একা কেমন লাগে? আমার কেমন লাগছে? আব্বা আম্মা জানলে কেমন লাগবে?
নীলুর ভাই বোনদেরও হয়তো ওর বিয়ে নিয়ে অনেক শখ। ওর বাবা মা হয়তো অনেক আশা করে আছেন ওর বিয়ে নিয়ে। ওর বোনেরা হয়তো বিয়ের দিন খুব সাজবে ওর সাথে সাথে।
ওর ছোট্ট ভাইটার মনেও হয়তো তীব্র আকাঙ্ক্ষা জমে আছে, ওকে একদিন বউ সাজে দেখবে।
সিফাত আহমেদ
সেশনঃ ২০১৯-২০
ডিপার্টমেন্ট হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট
