সরীসৃপ
খটাং করে গোসলখানার দরজা লাগিয়ে দিলো হেনা। সকাল থেকেই তার মেজাজ অকারণেই
খুব খারাপ হয়ে আছে। গোসলখানায় ঢুকেই দেখে সাবানের কেসে সাবান নেই। কাপড়-চোপড়
নিয়ে বের হয়ে এলো সে।
মা, ঘরে সাবান নেই?
হেনার মা রান্নাঘরে তরকারি কুটছিলেন। হাত ধুয়ে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বললেন।
নারে মা ঘরে আর সাবান নেই। পাশের বাসার অন্তুকে দিয়ে আনিয়ে নিচ্ছি দাঁড়া।
হেনার কিছু কঠিন কথা শুনিয়ে দিতে ইচ্ছে হচ্ছিলো। হেনার কিছু বলার আগেই মা
সামনে থেকে চলে গেলেন।
হেনা তার ঘরে এসে বিছানায় টান হয়ে শুয়ে পরলো। স্কুলে আজকেই শেষ পরীক্ষা। হলে
গার্ড পরেছে যেতেই হবে। এমনি সাধারণ ক্লাস থাকলে আজকের দিনটা ছুটি নিয়ে নিত। সকালে
গোসল করে স্কুলে যাওয়ার অভ্যাস হেনার। ভীষণ বিরক্তি লাগছে ওর।
কিছুক্ষণ পর হেনার মা আসে তার ঘরে। হেনা, এই নে সাবান।
হেনা চুপচাপ সাবান নিয়ে গোসল করতে চলে যায়। আজ গোসলে খুব সময় লাগেনা হেনার।
একটা বেগুনি সূতির শাড়ি নামিয়ে খুব দ্রুত কুচি করে নেয় ও। কুচি খুব একটা ভালো হয়নি
কিন্তু ঠিক করার সময় নেই। ভেজা চুল আঁচড়ে বেণী করেছে। মোটামুটি লম্বা গড়নের
শ্যামলা গোল মুখ। চেহারায় কেমন একটা কাঠিন্য ভাব আছে ওর মধ্যে। সবাই যেন একটু ভয়ই
পায় ওকে। হেনার বিষয়টা মাঝে মাঝে খুব মজা লাগে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে অনেকক্ষণ
দেখতে থাকে হেনা। মায়ের ডাকে তার ভাবনায় ছেদ পরে।
-কিরে খাবিনা?
-না মা। দেরি হয়ে গেছে।
বিছানায় রাখা শালটা গায়ে জড়িয়ে নেয় হেনা। তাড়াহুড়ো করে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে
বের হয়ে যায়। আজ কোনো রিকশা পাবেনা সে। যেদিন তার দেরি হয়ে যায় সেদিনটাই হেনা কখনো
রিকশা পায়না। হেঁটে গেলে স্কুল আরো বিশ-পঁচিশ মিনিটের পথ। হেনা রিকশার অপেক্ষা না
করেই হাঁটা শুরু করলো। স্কুলে যখন পৌঁছেছে তখন দশটা তেরো বাজে আর পরীক্ষা শুরু হয়
দশটায়।
পরীক্ষা শেষ হলো দুপুর একটায়। টিচার্স রুমে বসে আছে হেনা। তার সামনে একটা
খাতা। এইমাসের খরচের হিসাব লিখছে সে। তার বাবা রিটায়ার্ড করেছেন চার বছর হলো। পেনশনের
টাকা যা পান তা দিয়ে বাড়ি ভাড়া আর নিজের টুকটাক খরচে চলে যায়। সংসারের বাজার খরচও
কিছু অবশ্য হয়ে যায়। বাকিটা হেনাই দেখে। মাসের শেষের দিকে হেনা হিসেব করতে বসে। সংসারে
দেয়ার পরেও তার কাছে অল্প কিছু বাকি থাকে। এই টাকা হেনা ব্যাংকে রাখে। আজ মাসের
বিশ তারিখ। কাল ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে আসবে।
‘কী ম্যাডাম! পরীক্ষা তো শেষ। সবাইতো চইলা যাইতেছে আপনে যাইবেন না?’ হেনার
একদম কান ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছেন পিটির শিক্ষক সাইফুল স্যার। বিশাল সাইজের একটা ভুঁড়ি
যেন শার্টের বোতাম ছিড়ে বের হয়ে আসতে চাইছে। ছোটখাটো ড্রাম সাইজ শরীরের ওপর টাক
মাথাটা লাগে ফুটবল মাঠের মতন। সবসময় বাদাম চিবোতে থাকেন আর ইঁদুরের মতো ছোট ছোট
চোখ দিয়ে কুৎসিত ভাবে তাকান। তার নামে স্কুলের ম্যাডাম ও ছাত্রীদের অনেক বাজে
অভিযোগ আছে। কিন্তু হেডমাস্টারের আপনা লোক হওয়ায় সেইসব অভিযোগের কিছুই হয়নি।
হেনা খাতা বন্ধ করে তার ব্যাগ নিয়ে রুম ছেড়ে বেড়িয়ে এলো। সাইফুল স্যার দাঁত
বের করে একটা বিশ্রী হাসি হাসলো। হেনা না শোনার ভান করে চলে এলো।
রাত আটটা। টেবিলে এক গাদা খাতা নিয়ে বসেছে হেনা। আজকেই শেষ পরীক্ষা ছিলো। ডিসেম্বর
মাস। বার্ষিক পরীক্ষার পর একটা লম্বা ছুটি। এই ছুটিতে খাতা দেখে শেষ করতে হবে। আজ
না করে কাল থেকে খাতা নিয়ে বসলেই হতো। কিন্তু করার মতো আর কিছু পাচ্ছেনা দেখেই
খাতা দেখতে বসেছে হেনা। বাবা তার কোনো এক বন্ধুর বাসায় দাওয়াতে গেছেন। হেনার ছোট
বোন মিনা বিছানায় শুয়ে গল্পের বই পড়ছে। সমরেশ মজুমদারের 'কালবেলা'।
ও এবার ক্লাস নাইনে। হেনার মতো গোল মুখ নয় কিছুটা লম্বাটে কিন্তু বেশ ফর্সা। পড়ালেখায়
মোটামুটি। তবে খুব গল্পের বইয়ের পোকা। হেনার মা তার বড় বোনের সাথে ফোনে গল্প করছেন।
বড়খালার সাথে কথা শুরু হলে মায়ের কথাই শেষ হয়না। মায়ের সব গল্পই হয় রান্না বিষয়ক। হেনার
ধারণা পরিবারের অবস্থা ভালো হলে মা রান্নায় দারুণ কিছু করতে পারতেন। যেহেতু তাদের
বাজার খরচ কম, এই কম খরচে যা কেনা যায় তাই দিয়েই তিনি
মাঝে মাঝে নতুন কিছু রান্নার চেষ্টা করেন। সবসময়ই যে ভালো হয় এমনো না। যেদিন
রান্না খারাপ হয় সেদিন সারাক্ষণই হেনার মায়ের মন খারাপ থাকে।
বড়খালার সাথে কথা বলা শেষ করে মা হেনার ঘরে আসেন।
এই হেনা, আজ কী খাবি? আলুভাজি করি? নাকি ফুলকপির ঝোল খাবি। তোর বাবা আজ বাজার
থেকে তাজা ফুলকপি এনেছে। নাকি আলু দিয়ে ফুলকপি ভাজি কোনটা খাবি?
একটা হলেই হলো মা। সবইতো এক।
কি একটা হলেই হলো। আলু আর ফুলকপি কি এক? এই মিনা তুই কি খাবি?
মিনা বই থেকে মুখ না তুলেই জবাব দেয়, আমি পড়ছি মা।
হেনার মা বিড়বিড় করতে করতে চলে যান। হেনা জানে মা এগুলোর কোনোটাই রাঁধবেনা।
অন্য কোনো কিছু রান্না করে বলবেন, দেখতো কেমন হয়েছে।
আজ শীতটা একটু বেশিই পরেছে। হেনার গায়ে একটা লাল রঙের চাদর। জানালার পাশে
দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে ঘন কুয়াশা। বাসার সবাই বড় খালাকে মান্য করেন। ভয় করেন। হেনার
কিছুই মনে হয়না। বরং বড়খালাই কেমন যেন হেনাকে এড়িয়ে এড়িয়ে চলেন। হেনার সামনে পরে
গেলে ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পরেন। কোনোমতে জিজ্ঞেস করেন, ভালো আছিস?
হেনা জবাব দেয়, ভালো আছি। তুমি ভালো আছো?
উত্তরের অপেক্ষা না করেই হেনা চলে যায়। বড়খালাকে আর অপ্রস্তুত করতে চায়না
সে। বাসার সবাই বড়খালাকে আপনি করে বললেও হেনা তুমি করে বলে। হেনার মাঝে মাঝে
অদ্ভুত লাগে আবার মজাও পায়। হেনার যখন তেরো কি চৌদ্দ বয়স তখন বড় খালার কোনো এক
আত্মীয়ের ছেলের সাথে বিয়ে হয় হেনার। কেনই বা অত ছোট বয়সে হেনার বিয়ে হয়েছিলো আর
কেনোইবা বিয়ের এক সপ্তাহ পর হেনার বড় খালা তাকে তার বাসায় রেখে গিয়েছিলেন হেনা
জানেনা। বাসায় আসার পর হেনা কখনো কাউকে এই সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেনি আর কেউ তাকে এ
নিয়ে কিছু বলেওনি। ঐ লোকটা সম্বন্ধে হেনার কিছুই মনে নেই। বিয়ে, বিয়ের
কয়েকদিনের কথা হেনা মনে করতে পারেনা। এর আগেও চেষ্টা করেছে অনেকবার কিছুই মনে
পরেনি।
-মিনা।
-বলো।
-আজ বাবা আসবেনা। তুই মায়ের সাথে গিয়ে ঘুমা। মাকে বলিস আমাকে যেন না ডাকে। আমি
এখন ঘুমাবো।
মিনা চলে গেলে হেনা দরজা বন্ধ করে লাইট অফ করে শুয়ে পরে। জানালা বন্ধ করে
না। জানালা দিয়ে শীতের ঠান্ডা বাতাস আসতে থাকে। হেনার প্রচন্ড শীত করছে।
বেশ বেলা করে ঘুম ভাঙে হেনার। দরজা খুলে বসার ঘরে আসে ও। বাবা খবরের কাগজ
পড়ছেন আর মা কাঁথা সেলাই করছেন।
-মিনা কই মা?
-তোর বড়খালার বাসায়। হেনার মা ভেবেছিলেন হেনা আরো কিছু জানতে চাইবে।
হেনা আর কিছু বললোনা। হাত মুখ ধুয়ে নাস্তা করে বেড়িয়ে গেলো। ব্যাংকে টাকা
জমা দিয়ে এসে হেনা তার এক স্টুডেন্টের বাসায় গেলো। স্টুডেন্টের বাসাটা দূর হয়ে যায়
বলে পড়ানো ছেড়ে দিয়েছে হেনা। গতমাসের বেতন দেয়নি ওরা। স্টুডেন্টের মা বলেছিলো
এইমাসের দশ তারিখের পর দিয়ে দেবেন। হেনার আর সময় করে যাওয়া হয়নি। হেনা রিকশা
নিলোনা। আজ তার হাঁটতে ভালো লাগছে, হাতেও প্রচুর সময়। কলিং বেল দুবার
চাপতেই দরজা খুলে দিলো।
-আসসালামু আলাইকুম আন্টি।
-ওয়ালাইকুম আসসালাম। কেমন আছো?
-জ্বি আন্টি, ভালো আছি। আপনি ভালো আছেন?
-আছি।
-আন্টি দশ তারিখের পর আসতে বলেছিলেন।
-ও হ্যা। আসলে তোমার টাকাটা খরচ করে হয়ে গেছে। বুঝোইতো মাসের প্রায় শেষ। তুমি
পরের মাসে এসো।
-আচ্ছা, বলে চলে এলো হেনা।
তার প্রচন্ড পানি পিপাসা পাচ্ছে। আন্টির কাছে এক গ্লাস পানি চাইতে পারতো। আন্টি
কি তাকে বলতো, এখনতো পানি নেই। তুমি কাল এসে পানি খেয়ে যেও।
হি হি করে হাসে হেনা। মাঝে মাঝে কি উদ্ভট ভাবনা ভাবে সে।
বাসায় ফিরে একটা লম্বা গোসল দেয় হেনা। বাবা বাসায় নেই। মা দুপুরে ভাত
খাওয়ার পর ঘুমিয়ে আছেন। হেনার ভাত টেবিলে ঢাকা দিয়ে রাখা। ফুলকপির ঝোল আর কড়কড়ে
আলু ভাজা। মায়ের রান্না খুব ভালো লাগে হেনার।
ভাত খেয়ে বারান্দায় যায় সে। বারান্দায় টবে গোলাপ গাছ লাগিয়েছে মিনা। টকটকে
লাল গোলাপ। মিনা প্রতিদিন বিকেলে গাছগুলোতে পানি দেয়। আজ হেনা পানি দিচ্ছে।
বারান্দা থেকে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুমিয়ে যায় হেনা। ঘুম ভাঙে
সন্ধ্যার পর। পাশ ফিরতেই হাত পরে মিনার বইয়ে। এই বইটাই কাল পড়ছিলো মিনা। হেনা উঠে
বসে। বই খুলতেই একটা কাগজ পায়। একটা চিঠি। মিনাকে লেখা হয়েছে। অতি নিম্নমানের
প্রেমপত্র।
হেনা তখন হয়তো ক্লাস সেভেনে। সাদা আকাশি স্কুল ড্রেস। লাল ফিতায় বাঁধা দুটো
বেণী। স্কুলে যাওয়ার পথে তাদের
বাড়ির গলির মুখে একটা ছেলে রোজ দাঁড়িয়ে থাকতো। ফর্সা গোল মুখ। চুল গুলো বেশ
কোঁকড়ানো। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। একদিন একটা চিঠি দিয়ে বসলো হেনাকে। গোটাগোটা
অক্ষরে একটা লাইনই লেখা। আমি তোমাকে ভালোবাসি হেনা। হেনা চিঠিটা তার স্কুল ব্যাগের
এক কোণায় রেখে দিয়েছিলো। কয়েকদিন কি ভয়েই না ছিলো হেনা। যদি মা বা বাবা চিঠিটা
পেয়ে যায়। এরপরতো হঠাৎ একদিন হেনার বিয়ে হয়ে যায়।
বিয়ের পরে যখন সে একেবারে বাবার বাড়ি চলে আসে তার একমাস পর হেনা আবার
স্কুলে যেতে শুরু করে। কিন্তু তারপর থেকে হেনা কখনোই ঐ ছেলেটিকে আর দেখেনি। বেশ
কয়েকদিন হেনা স্কুলে যাওয়ার সময় গলির মুখে দাঁড়িয়ে থাকতো।
তার আবার বিয়ের প্রসঙ্গে মা বাবা কখনো কথা বলেন না। যদি বলতেন তাহলে সে কি
বলতো, ভাবতে থাকে হেনা।ভাবতে থাকে যদি হঠাৎ কোনো একদিন সেই ছেলের সাথে তার
দেখা হয়ে যায় হেনা অবশ্যই তাকে চিনবে। হেনা
ভাবে ছেলেটি কি তাকে বিয়ে করবে? লজ্জায় লাল হয় হেনার মুখ। বিয়ের দিন সে সবুজ রঙের
শাড়ি পরবে। ছেলেটি তাকে দেখে বলবে, সবুজ কইন্যা।
ঠোঁট চেপে হাসে হেনা। হুট করে মা চলে আসায় হেনার লজ্জা করতে থাকে।
মা একটা ছবি হেনার সামনে দিয়ে বললেন, দেখতো ছেলেটা কেমন?
হেনার বুক ধক করে ওঠে। মায়ের দিক তাকাতে পারেনা সে। লজ্জায় চোখ মেলতে
পারছেনা হেনা।
মিনার জন্য সম্বন্ধ এসেছে। ছেলে ডাক্তার। মিনার চেয়ে ফর্সা হবে কি বল। আজ
মিনাকে দেখে গেছে। তোর বাবাকেও বড়আপার বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছি। মেয়ে পছন্দ হলে নাকি
বিয়ে পড়িয়ে নেবে বলেছে। তোর বড়খালাকে কয়েকবার ফোন দিয়েছি ধরছেনা। কি জানি ওখানের
কি অবস্থা। বিয়েই হয়ে গেলো কিনা।
মায়ের ফোন বেজে উঠতেই মা ফোন নিয়ে অন্য ঘরে চলে গেলো।
ছবি হাতে স্থির বসে আছে হেনা। অসহ্য বুকে ব্যাথা হচ্ছে তার। বুকে হাত চেপে
শুয়ে পরলো হেনা। তার নিজেকে সরীসৃপ মনে হচ্ছে। সরীসৃপের মতো বুকে ভর দিয়ে চলছে সে।
তার বুকে প্রচন্ড যন্ত্রণা।
ফাতেমা তুজ জোহরা
সেশনঃ ২০১৯-২০
ডিপার্টমেন্ট অফ হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট
