10 March, 2021

মৃত্যুঃ আয়শা সিদ্দীক


 মৃত্যু

"মৃত্যু কী?"

 

আচমকা এমন প্রশ্ন শুনে শাহাদাত ফিরে তাকাল আকাশের দিকে চেয়ে বারান্দায় বসে থাকা নিহার দিকে।আর অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে জিঙ্গেস করলো,

 

- মানে?

 

নিহা উদাস ভঙ্গিতে বললো,

 

- মৃত্যু মানে কী?

 

সে দু-তিনটা বড় বড় শ্বাস নিয়ে জবাব দিলো,

 

- চিরন্তন সত্য। যে সত্যকে অস্বীকার করার ক্ষমতা কারো নেই।

 

নিহা প্রশ্নময় দৃষ্টি ফেলে আবার প্রশ্ন করলো। 

 

-কারো ক্ষমতা নেই?

 

-না।কেন এসব প্রশ্ন?তুমিতো ভালো করেই জানো। দৃঢ় হয়ে বললো সে।

 

নিহা আগের ভঙ্গিতে বললো,

 

-এমনি।তুমি কী মনে করো মৃত্যুকে জানতে মন বলছে তাই।

 

-আচ্ছা।মৃত্যু সবারই হবে।দশ তালায় পায়ের উপর পা তুলে আরম করে থাকা মানুষেরও হবে।আবার রাস্তায় পড়ে থাকা মানুষেরও হবে।এই কথা না মানার ক্ষমতা করো নেই মানে কারোই নেই। ভাবুক হয়ে বলতে লাগল সে।

 

নিহা প্রশ্ন ছুঁড়লো,

 

-তাহলে আমাদের এত ছোটাছুটি কেন?কার জন্য?

 

-বাঁচার জন্য।

জবাব দিলো সে।

 

নিহা ভ্রু কুচকানো আর জিজ্ঞেস করলো,

-বাঁচার জন্য? কিন্তু মরে যাব জেনেও কেন সবাই বাঁচতে চায়?কেন?

 

-মৃত্যু নামের একটা সীমারেখা আছে বলেই মানুষ বাঁচতে চায় অন্যথায় কেউ বাঁচতে চাইতো না।ধরো একটা দৌড় প্রতিযোগিতায় যদি সীমানা নির্ধারন করে না দেয় তাহলে কেউ কি প্রতিযোগিতায় নামতো? সে বললো।

নিহা মনযোগী হয়ে তাকালো তার দিকে। সে আবার বলা শুরু করলো,

 

- নামতো না কেউ।সারাক্ষণ দৌঁড়ালেও এই পৃথীবি একজনেও শেষ করতে পারবে না।একটা অনিশ্চিত পথের দিকে কেউ এগুতে চায় না।জীবনটাও ঠিক তেমনি। এই ধরো জীবন মৃত্যু দিয়ে যদি সীমানা আঁকা না হতো অনন্তকালের জীবন হতো তাহলে কি তুমি বাঁচতে চাইতে?

 

নিহা পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো তার দিকে,

 

-চাইতাম না? এখন যেমন করে বাঁচতে চাই তখন চাইতাম না?

 

-না, চায়তে না। বেঁচে থাকার পরিবর্তে চায়তে মরতে।না চাইতে পেয়ে যাওয়া জিনিসের মূল্য আমরা দিতে জানি না।আরেকটা মজার বিষয় কী জানো?সে বললো।

 

নিহা মাথা নাড়ালো অর্থাৎ সে জানে না।

সে আবার বলা শুরু করলো,

 

-কত বছর পর্যন্ত একজন মানুষ বাঁচবে? কে কত বছর বাঁচে?

 

নিহা আস্তে করে জবাব দিলো,

 

-জানি না।

 

সে আবার বললো,

 

-হ্যাঁ। এটাইতো কৌতূহল। আর কৌতূহলের বিষয়টা বের করতে মানুষ উঠে পড়ে লাগে।

নিহা ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো,

 

-আচ্ছা যদি আল্লাহ জানিয়ে দিতো আমি জন্মের পর ত্রিশ বছর বাঁচবো! তাহলে কি বাঁচতে চাইতাম না?

 

-বাঁচতে চায়তে না বিষয়টা এমন না তবে এইটুকু বলতে পারি তুমি বাঁচতে জীবন্ত লাশ হয়ে।সে জবাব দিলো।

 

নিহা আবার প্রশ্ন করলো,

 

-কেন?জীবন্ত লাশ হয়ে কেন?

 

-এই ধরো তুমি জানো ত্রিশ বছর পর্যন্ত তোমার আয়ু। তারপর তুমি যে কাজই করতে যেতে সেখানেই হিসাব করতে থাকতে আর নিরাশ হতে। নিরাশ হয়ে হয়তো বলতে আর মাত্র ক'দিন বাঁচব! দু'একজন হয়তো ব্যাতিক্রম হতো তবে বেশীর ভাগ মানুষই নিরাশ হয়ে সেকেন্ড-মিনিট-ঘন্টা-দিন-মাস-বছর এসবের হিসাব কষতো।জীবনটাকে সংকীর্ণ করে ফেলতো।

 

নিহা কতক্ষণ চুপ করে থেকে প্রশ্ন করলো,

 

-তাহলে জীবন কী? এভাবে ভালো চাকরি, ভালো কাপড়, ভালো খাবার, অনেক টাকা, বড় বাড়ি-গাড়ি এসব অর্জনের জন্য?

 

সে জবাব দিলো,

 

-না, মোটেই না।জীবন একটা পরীক্ষা। ভালোটা বেছে নেওয়ার পরীক্ষা।আল্লাহর পথ খোঁজে নেওয়ার পরীক্ষা।কেউ পারে কেউ পারে না।যারা পারে তারই সফল। আল্লাহকে যে খোঁজে পায় তাঁর এতো গাড়ি-বাড়ি-টাকার প্রয়োজন হয় না।সে অল্পতেই ভালো থাকাটা আয়ত্ত করে নিতে পারে।সবসময় এসব থাকবে এমন কোন কথা নেই।তবে হ্যাঁ, জীবনটা চালিয়ে যেতে হবে।নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)যেভাবে জীবন চালিয়েছেন ঠিক তেমনি।

 

নিহা আবার প্রশ্ন করলো,

 

-তাহলে কেন তুমি ছোটাছুটি করো?

 

-ওই যে প্রথমে বলেছিলাম-বাঁচার জন্য।

বাঁচার জন্য ছুটছি রোজ।সে জবাব দিলো।

নিহার চোখ ছলছল করে উঠলো।ছলছল চোখে বললো,

 

-আমিও বাঁচতে চাই।আর এই বাঁচার জন্যেইতো রোজ রোজ হাসপাতালে যাচ্ছি।এতো এতো টাকা খরচ করছি। তোমার সব সম্পদ শেষ করছি। বার বার ক্যামোথেরাপি দিয়ে এসে বলছি আরও বাঁচতে চাই।কয়েকমাস পর নিশ্চিত চলে যাব জেনেও। যত সময় ঘনিয়ে আসছে তত বাঁচার আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মৃত্যু হবে কিন্তু আমি কী সে পথ খোঁজে পেয়েছি?যে পথে সফলতারা হাতছানি দেয় সে পথ?

 

সে চুপচাপ শুনতে লাগল সব।একটুও শব্দ করলো না। নিহা আবার প্রশ্ন করলো,

 

-এরপর?

 

সে বললো,

 

-কবর।সবার শেষ ঠিকানা কবর নামক মাটির ঘর। বড় বাড়ি,গাড়ি,সম্পদ,চাকরি,আত্মীয় স্বজন কেউ সঙ্গ দেবে না।একা একা চলে যেতে হবে। ঐ ঘরে শুধু আলো হয়ে থাকবে তোমার আমল।

 

দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিহা বললো,

 

-কবর।

 

সে বললো,

 

-হুঁ।

 

নিহা আবার বললো,

 

-আচ্ছা তোমরা ছেলেরাতো জানো তোমার কবর কোথায় হবে।বলতে গেলে সব বুঝতে শুরু করার পর থেকে জেনে যাও যে মাটিতে শৈশবে দাপাদাপি করে এপাড়া ওপাড়া ঘুরে বেড়িয়েছ সে মাটি একদিন টেনে নিবে।দেশ ছেড়ে সুদূর বিদেশ পাড়ি জমালেও মৃত্যুর পর কফিন করে লাশ ফিরবে সেই চিরচেনা মাটিতে।কিন্তু আমরা মেয়েরা কি জানতে পারি?কোথায় আমাদের কবর হবে? অন্তত বিয়ে হওয়ার আগ পর্যন্ত জানতে পারি না।শৈশবে দুরন্ত ছুটে চলা সেই আপন মাটিতে আমাদের কবর হয় না।আমাদের কবর হয় অচেনা অজানা এক মাটিতে। যেই মাটি কখনও আপন ছিল না কিংবা হয়তো আপন।

সে নিহার দিকে তাকালো আর প্রশ্ন করলো,

 

-তুমি কী চাও?তোমার মৃত্যু কিভাবে হোক?আর কবর?কবর কোন মাটিতে হোক?

 

নিহা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,

 

-সেদিন বৃষ্টি হোক।গুড়িগুড়ি বৃষ্টি না ঝুম বৃষ্টি। আমার জন্য আকাশও কাঁদুক।মৃত্যু মুখে কালিমা নসীব হোক। শেষ সময়ে ইমান নিয়ে আমার মৃত্যু হোক।আর কবর অজানা মাটিতে হলেও আফসোস নেই।মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যত সব চাওয়া পাওয়া।এরপর যেমন হবে হোক। চিরচেনা মাটি হোক কিংবা অচেনা কবরের চাপতো একই থাকবে মাটি ভেদে কবরের চাপতো আর কম হবে না।

 

কোনো এক স্নিগ্ধ সকালে

কিংবা পড়ন্ত বিকেলে

বৃষ্টি স্নাত এই শহরে

মৃত্যুর ফেরেশতা আসুক নেমে।

প্রাণ নিয়ে ফিরে যাক নিঃশব্দে।

 

-হুম।এরপরতো শুরু হবে অনন্ত একটি জীবন।হাশরের ময়দানে একিভূত হওয়া।তারপর একে একে চলতে থাকবে নিজের করা কাজের দৃশ্য।এসব ভাবতেই কান্না আসে। আল্লাহই ভালো জানেন আমার কী হবে!আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে নাকি বাম হাতে!জাহান্নামে যাব নাকি জান্নাতে!এসব ভাবতেই ভয় হয়। তোমার ভয় হয় না? সে বললো।

 

নিহা মন খারাপ করে জবাব দিলো,

 

-হ্যাঁ। খুব ভয় হয়।আমিতো জান্নাতে যেতে চাই।

 

-শুধু যেতে চাইলেই কি যাওয়া যায়?আজ সারাদিন জান্নাতে যাওয়ার মতো কোনো কাজ করেছ কি?সে বললো। 

 

এরপর আর কেউ কোন কথা বলেনি। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে আসছে।চারদিক অন্ধকারে বিলীন হচ্ছে। সেই চেনা আকাশ, প্রকৃতি সব মিলিয়ে যাচ্ছে দূরে কোন এক সীমানায়। সেই অন্ধকারে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে তারা দু'জন।মিলিয়ে যাচ্ছে একজন মৃত্যুপথযাত্রী। 



নাম: আয়শা সিদ্দীক (Aysha Siddek)

সেশন : ১৭-১৮

ডিপার্টমেন্ট: ব্যাংকিং এন্ড ইন্স্যুরেন্স (Banking  and Insurance)