14 June, 2021

খুমের রাজ্যের গল্পঃ Puja Dey



 খুমের রাজ্যের গল্প

"Travel leaves you speechless; then turns you into a storyteller"

-Ibn Batuta

ভ্রমণ প্রকৃত অর্থেই একজন ব্যক্তিকে গল্পকথক হতে বাধ্য করে। ভ্রমণ কোনো বিলাসিতা নয় বরং এটি হচ্ছে আত্মার খোরাক যোগানোর নির্মল মাধ্যম। একজন পাহাড়প্রেমী হিসেবে আমার বেশিরভাগ ঘুরাঘুরি পাহাড়েই। এবারও পাহাড় নিয়ে কিছু গল্প করা যাক। 

যদিও প্রায় একবছরের ও বেশি সময় আমরা করোনা নামক মহামারীতে আক্রান্ত। তারপরেও বদ্ধ জীবন থেকে সামান্য মুক্তির জন্য জানুয়ারির ২০ তারিখ আমরা ১৬ জন রওনা দিলাম বান্দরবানের উদ্দেশ্যে। বৃহস্পতিবার সকাল ৭টায় আমাদের যাত্রা শুরু হলো । ঠিক ১০টায় আমরা বান্দরবান বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছালাম..তাজিংডং রেস্টুরেন্টে প্রাতঃরাশের পর চাঁদের গাড়ি হাজির। এ গাড়ির সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল ছাদবিহীন,যার কারনে নীল আকাশ দেখতে দেখতে আপনি কখন গন্তব্যে পৌঁছাবেন টেরও পাবেন না। এছাড়া পাহাড়ি সৌন্দর্য তো আছেই। যাওয়ার পথে মিলনছড়ি, নীলাচলসহ বেশ কিছু স্পটের দেখা মিলবে,সময় থাকলে টুক করে কিছুক্ষন সময় ও কাটাতে পারেন। আমরা অবশ্য তা করলাম না।  ওয়াইজংশনের চেকপোস্টের পর আমাদের গাড়ি সোজা গিয়ে থামল বলিপাড়ায়। সেনাবাহিনীর তত্বাবধানে এখানে বেশ মনোরম একটি ক্যাফে রয়েছে.."পারিজাত গার্ডেন" নামের এ ক্যাফেটি বেশ সুন্দর আর এর বিশেষত্ব হচ্ছে মৌসুমি ফলের জুস..আর বান্দরবান গিয়ে পেঁপে কিংবা পেঁপের জুস না খাওয়া অন্তত আমার কাছে বিরাট কিছু মিস করা। আমরাও জলপাই আর পেঁপের জুস খেয়ে আরেকবার চাঙ্গা হলাম। সবধরনের চেকিং এর পর আবার গাড়িতে উঠে সোজা সাংগু নদীর উদ্দেশ্য গাড়ি চলতে শুরু করল। বেশি দেরি করলে হয়ত বোট পেতে ঝামেলা হতে পারে। নদীর পাশের একটা হোটেলে খুব দ্রুত দুপুরের খাবার শেষ করলাম..ব্যাগপত্র নিয়ে নৌকায় উঠলাম এবং মাঝিভাই ইঞ্জিন চালু করলেন। মূলত বর্ষায় এ নদীর ভরাযৌবন হলেও শীতে এর সৌন্দর্য একদম অমলিন..স্বচ্ছ ঠান্ডা পানি, দুপাশের প্রকৃতি ও পাহাড়ি মানুষের জীবনযাত্রা দেখতে দেখতে সময় কেটে যাবে.. পথে পড়ল তিন্দু, বড় পাথর সহ বেশ কিছু স্থান। এসব দেখতে দেখতেই ৫টায় আমরা পৌঁছে গেলাম রেমাক্রি..এই জায়গাটা সুন্দর হলেও আমরা থাকতে পারলাম না কারন বেলা প্রায় শেষ। যাত্রা শুরু হল থুইসা পাড়ার উদ্দেশ্যে। শুরুতে আমি ও অন্যান্য টিম মেম্বাররা বেশ দ্রুতই আগাতে লাগলাম, কারণ পাড়ায় পৌঁছাতে বেশ  রাত হবে। এই ভ্রমনের সবচেয়ে ভয়ংকর সুন্দর অংশই হচ্ছে  রাতের বেলা ট্রেকিং। "কোথাও কেউ নেই" গল্পের মত আমাদের আশেপাশে কেউ ছিল না। গা ছমছমে পরিবেশ বিপদসংকুল রাস্তা আবার আরাকান বাহিনীর ভয়।একে অপরকে সাহায্য করতে করতে নাফাখুম পৌঁছে গেলাম। যদিও অন্ধকারের কারণে কিছুই দেখতে পাইনি, কিন্তু সেই খুমের শব্দ আর চন্দ্রালোকিত রাত বেশ স্মরনীয় হয়েই থাকবে। আরো কিছু চড়াই-উৎরাই পাড়ি দেয়ার পর আমরা থুইসাপাড়ায় হাজির হলাম রাত ১২.২০ নাগাদ। কোনোমতে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে শরীরকে বিশ্রাম দিলাম। কারন পরেরদিনের গন্তব্য আরো কঠিন..

ঠিক সকাল ৬.৩০টায় ঘুম ভাঙলো। হাতমুখ ধুয়ে গরম গরম ডিম খিচুড়ি দিয়ে উদরপূর্তি করে ফেললাম। আজকের গন্তব্য আমিয়াখুম, ভেলাখুম, সাতভাইখুম.. কিন্তু তার আগে পাড়ি দিতে হবে দেবতা পাহাড়। ৯০° খাড়া এই পাহাড় অতিক্রম করা বেশ কষ্টদায়ক.. আর যদি হাইটফোবিয়া থাকে তাহলে তো কথায় নেই..এখানে এসে দেখা মিলল দেশের অন্যান্য প্রান্ত থেকে আসা বিভিন্ন বয়সের ভ্রমণকারীদের সাথে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় প্রত্যেকটা মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল..অবশ্য সহযোগিতা ও উদার মনোভাব প্রায় প্রত্যেক ভ্রমণকারীরই বৈশিষ্ট্য..পাহাড় পেরিয়ে আমরা প্রথমে গেলাম ভেলাখুমে। সবুজ পানি আর বুনো পাহাড়ের সৌন্দর্য আপনাকে আবার মনে করাতে বাধ্য করবে যে আমাদের দেশ প্রকৃতির রূপসী রাজকন্যা। দৃশ্য উপভোগ করতে করতে বেশ কিছু ছবি তোলা হল..কয়েকজন খুমে সাতাঁরও কাটল..সাতভাইখুম দেখা শেষে আবারও ফিরতে হবে পাড়ায়..তবে আসতে যতটা কষ্টসাধ্য মনে হয় ফেরার বেলায় ততটা দুঃখ লাগে.. এ স্থানগুলোতে এখনো নাগরিক সভ্যতা বা আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। কিন্তু একবারও প্রয়োজন  মনে হয় না আধুনিকতার..পাহাড়ি সহজ সরল মানুষ আর তাদের অমায়িক হাসি আপনার মন ভালো করতে বাধ্য। রাতটা কাটল হ্যাপিদির বাড়িতে.. জুম চালের ভাত আর পাহাড়ি মোরগের মাংসের ভুরিভোজ শেষে আবার বিশ্রামে। কারন পরেরদিন ফিরে আসতে হবে এই ইট-পাথরের শহরে।

শেষ দিনেও খুব ভোরে উঠেই তৈরী হতে হলো। ১২টার মধ্যে রেমাক্রি পেরুতে হবে..যাওয়ার পথেই হালকা নাস্তা করে নিলাম। এরমধ্যে আমরা দেখে নিলাম নাফাখুম। প্রথমদিন যে জলপ্রপাতের শব্দে মুগ্ধ হয়েছিলাম আজ তা সাক্ষাতে দেখে বিমোহিত হলাম।  তবে কষ্ট লাগল এখানে ব্রিজ নির্মানের কাজ দেখে। পাহাড় জলপ্রপাত এসব তো স্বাভাবিকভাবেই সুন্দর। এখানে নগরায়নের কী প্রয়োজন?

ঠিক একই পথে সন্ধ্যা ৭টায় বাসস্ট্যান্ডে চলে এলাম। টিকেট কেটে যে যার সিটে বসে পড়লাম..ক্লান্ত শ্রান্ত শরীরটাকে এলিয়ে দিয়ে একরাশ সুখস্মৃতি নিয়ে ফেরত এলাম চট্টগ্রামে।  সত্যি বলতে নেটওয়ার্কের বাইরে এই তিনদিন শুধুমাত্র আনন্দের খোরাক নয় বরং নিজের দেশ, দেশের মানুষদের জানার এক নতুন এডভেঞ্চার.. প্র‍তিকূল অবস্থায় হাসিমুখে পাড়ি দেয়া কিংবা বয়সে ছোট গাইডের সাথে হাসিতে লুটিয়ে পড়া কোনোটারই কমতি ছিল না। আবারও যেন সুযোগ হয় নতুন কোনো এডভেঞ্চারের।

নিজে ভ্রমন করুন এবং অপরকে ভ্রমনে উৎসাহিত করুন। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখবেন আপনার দ্বারা যেন প্রকৃতির সামান্যতম ক্ষতিও না হয়।



Puja Dey 
Department of Marketing 
Session: 2016-17