10 August, 2021

শ্রমিকীয় ঈদঃ মো: জুনাইয়েদ শাহরিয়ার সাফি

 (১)

রাত প্রায় নয়টা বেজে গেছে। আছাদ মিয়ার হাত চলছেই। যেমনেই হোক আজ কাজটি শেষ করতেই হবে। ইট ভাঙ্গার শ্রমিক সে। বড়ই অভাব অনটনের সংসার। কাল ঈদ। অথচ জামা কিনা তো দূরের কথা, কাল ভাত রান্না করার জন্য চালের পয়সা ও নাই। তাই মহাজনের কাছে এসেছিল। যদি কিছু টাকা ধার দেয়। মহাজনের সাফ কথা কাজ ছাড়া একটাকাও তিনি কাউকে দিবেন না। তাই আজ ভোরবেলা থেকেই সে কাজ করছে। বাকি সব শ্রমিক বাড়ি চলে গেছে। রোজা রেখে ভোর থেকে ইট ভেঙ্গে চলেছে। মাঝখানে একটু পানি খেয়ে রোজা ভেঙ্গেছিল। এখন আবার কাজ করছে। মাঝে মাঝে মহাজনের সাগরেদ ছালামত এসে কাজ দেখে যাচ্ছে। তাড়া দিচ্ছে  কাজ শেষ করার জন্য।


(২)
-আম্মা, ও আম্মা,  আব্বা আইবোনা?'
-আইবো বাবা। দেখবি আইজ তোগো লাইজ্ঞা নতুন জামা লইয়া আইবো। একটু অপেক্ষা কর বাবা।
আছাদের আট বছরের ছেলেটি কাল রাত থেকে কিছু খায়নি। বাবা বাজার করে আনলে মা রাধবে তবেই খাবে। আপাতত নতুন জামার কথা শুনে আনন্দে পেটের ক্ষিদে  চাপা দিচ্ছে।
(৩)
আজ রনি সাহেব তার স্ত্রী - কন্যা নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। আজ তিনি নিজেই ড্রাইভ করে বাড়ি যাবেন। সকাল থেকেই হই-হুল্লোড় চলছে। ১০ টার দিকে রওনা দিয়ে দিলেন তারা। কোন জ্যাম না পড়লে রাত ১২ টার দিকে বাড়ি পোছাবেন। কাল ঈদ (ইদ)। তাই খুশি মনে বাড়ির পথে তিনি। এরই মধ্যে তার বাবা ৪ বার কল করেছেন। তার বাবা গ্রামের মহাজন। এত বেশি ব্যস্ততার মাঝেও তার খবর নিচ্ছেন বলে খুশিতে তার চোখ দিয়ে  পানি এসে গেছে। হাজার হলেও বাবার ভালোবাসা।
.


(৪) রাত ১১টা। আছাদ মিয়ার কাজ প্রায় শেষ। মহাজন বাড়িতে টাকার জন্য গেলেন তিনি। চকচকে ৫০০ টাকার তিনটি নোট দিয়ে মহাজন তার পিঠ চাপড়িয়ে বললেন এগুলা কাজের টাকা আর কিছুটা ঈদের বকশিশ।  ছেলে মেয়ে নিয়ে যেন ভালো করে ইদ করে।
টাকাগুলো পেয়ে আছাদ মিয়া যেন আকাশের সেই বাঁকা চাঁদ টা পেলেন। ছুটে গেলেন গঞ্জের দোকানে। বউ আর ছেলের জন্য একটা শাড়ি আর একটা লাল টুকটুকে শার্ট কিনলেন। ছেলেটা নিশ্চয়ই অনেক খুশি হবে। এরপর চাল কিনলেন। সবজি কিনলেন। চিনি সেমাই ও নিলেন। ঈদ তো আর প্রতিদিন আসে না। খুশিমনে বাড়ি ফিরছেন। এইতো তার বাড়ি আর বেশি হলে ২০ মিনিট। গঞ্জের সামনে যে বড় সড়কটা আছে তার পাশে দিয়ে হেটেই যাওয়া যাবে।


(৫)
দরজায় খুট খুট আওয়াজ হচ্ছে। আছাদ মিয়ার বঊ বসা থেকে উঠলেন। ছেলেটা আজ রাতেও না খেয়ে ঘুমিয়েছে। তার বয়সী ছেলেদের তুলনায় অনেক দুর্বল সে। যাতে ভাত খেতে না হয় তাই সেও রোজা রাখে। দরজায় আওয়াজ হয়েই চলছে।
'আইতাছি' বলে দরজা খুলতে চললেন আছাদের বউ। যেতে যেতে চিন্তা করলেন আজই তার জামাইকে বলবেন কাজ করার কথা। তাহলে সংসারের অভাব হয়ত একটু কমবে। 
দরজা খুললেন। দরজায় দাঁড়িয়ে মহাজনের সাগরেদ নাফিজুল।
'-আন্নেরে মহাজনের বাড়িতে যাইতে হইবো'
-কিল্লাই?
-এখন কথা কইয়েন না। তাড়াতাড়ি চলেন।
-আইচ্ছে আইতাছি।
তাড়াতাড়ি করে মহাজনের বাড়ির দিকে চললেন আছাদের স্ত্রী। পথ যেন শেষ হচ্ছেনা । মহাজনের উঠানে ঢুকেই গগনবিদারী আওয়াজ করে কেঁদে উঠলেন। এ তিনি কি দেখছেন!!!
তার স্বামী আর নেই।  গঞ্জের রোড পার হওয়ার সময় মহাজনের ছেলে রনির গাড়ি ব্রেক ফেল করে মেরে ফেলেছে তার স্বামীকে। কাঁদতে কাঁদতে হেসে উঠছেন আছাদের স্ত্রী। আজ যে ঈদ। এদিন যে কারও কাঁদতে নেই।
সকাল হলো। সবাই ঈদের নামাজের পর জানাজা দিয়ে কবরস্থান এর দিকে চলল।
দূর থেকে মায়ের পাশে দাড়িয়ে দেখছে আছাদের ছেলেটা।  বাবার কিনে দেওয়া নতুন টুপি আর নতুন শার্টটা পরেই বাবার জানাজা পড়েছে সে। মায়ের কাছে ছোটকাল থেকেই সে শুনে এসেছে ঈদ নাকি অনেক খুশির দিন। এইদিন নাকি কাঁদতে নেই। কিন্ত তার কান্না আজ বাধ মানছে না। ক্ষনে ক্ষনে বাষ্প হয়ে উড়ছে সে গুলো। ফোলা ফোলা চোখে দিগন্তজোড়া আকাশের দিকে তাকালো সে। তার অবচেতন মন যেন খোদাকে জিজ্ঞেস করছে,  ' হে  খোদা, ঈদ কি সবার জন্যই আনন্দের?'

.

মোঃ জুনাইয়েদ শাহরিয়ার সাফি
ডিপার্টমেন্ট অফ হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট।
সেশনঃ ২০১৭-১৮।