২০১৭ সাল, আমি তখন হতাশার মাঝ পথে। অর্থহীন জীবন ও প্রচন্ড বিষণ্ণতা আমাকে শীতের চাদরের মতো জড়িয়ে ধরেছিল। মনের সাথে এক বিরাট যুদ্ধ শেষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা সীট নিজের করে নিয়েছিলাম। জীবনটা বা প্রতিটা মূহুর্ত যখন অনুভূতিহীন ছিল, সে সময় একটু শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন মহান সৃষ্টিকর্তা।
কোন ধরনের অনুভূতি, উত্তেজনা, ভাললাগা ছাড়াই নতুন বছরের প্রথম দিন ৩ নং বাসে করে অরিয়েন্টেশন ক্লাসে যায়। আমার চেহারা, ড্রেসে ফুটে উঠেছিল প্রচন্ড অবহেলার ছায়া। যেন ছন্নছাড়া দরিদ্র পরিবারের মেয়ে অথবা নিপীড়িত কোন নারী। সবকিছুই অটো মনে হতো। মনে হতো আমি কোন পদার্থ। অন্য কারো দ্বারা পরিচালিত হচ্ছি। খাওয়া দাওয়া, ঘুম, ভার্সিটি আসা-যাওয়া, ক্লাস করা, নতুন কয়েকজন বন্ধুদের সাথে কষ্ট গুলো শেয়ার করা সবকিছু মনে হতো কোন রোবট দ্বারা চালিত হচ্ছে। নতুনত্বে বরাবরই আমি দুর্বল। নতুন বা পরিবর্তনে নিজেকে এডজাস্ট করতে পারিনা সহজে। সাথে যোগ দিয়েছিল বিষণ্ণতা।
কয়েকমাস শুধু ক্লাসে গিয়ে বসে থাকতাম একটা বেঞ্চে। ওই সীটে বসেই ক্লাস শেষে সরাসরি বাসায়। খুব ইচ্ছে হতো বন্ধুদের সাথে কথা বলি বা করিডোরে গিয়ে তাদের সাথে আড্ডা দিতে। কিন্তু কি যেন আমাকে বাঁধা দিতো। মোটামুটি মিশুক আমি খেয়াল করলাম মানুষের সাথে কোন ভাবেই মিশতে মন সাঁই দেয়না। সবার মধ্যে ভার্সিটিতে সুযোগ পাওয়ার আনন্দ। যে যার মতো উৎযাপন করছে। আমি শুধু দেখতাম। আমার মনে হতো আমার কিছুই হয়নি যেন ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি অনেক বছর হলো। এতটায় হীনমন্যতা এসেছিল যে বাসে যখন উঠতাম পাশে শাটল যাওয়ার সময় দেখে থাকতাম আর ভাবতাম শাটল কি সবার জন্য, কীভাবে শাটলে যাওয়া যায়। সবকিছুই অদ্ভুত লাগতো। দম বন্ধ হওয়া নিঃশ্বাস প্রতিবারই আমাকে আরো বেশি হীনমন্যতার দিকে নিয়ে যাচ্ছিলো। খাঁচায় ছটফট করা পাখির মতো মুক্তির পথ খু্ঁজতাম।
একদিন একজন বন্ধু কে সাহস করে বলেই ফেললাম আমাকে যেন শাটলে কীভাবে শহরে যায় দেখিয়ে দিতে। সেদিন প্রথম শাটলে উঠা, দিন বা তারিখ মনে নাই। হসপিটাল বগিতে তার সাথে বসেছিলাম আর সাথে ছিল কলেজের পরিচিত কিছু বান্ধবী। সেদিন শাটলের শেষ গন্তব্য নিউ মার্কেটে নেমে, বাকিটা পথ বাসে করে বাসায় এসেছিলাম। সেদিন শাটলের ভীড় আমাকে মুগ্ধ করেছিল, জানালা দিয়ে বাহিরের সবুজ প্রকৃতি, দরজায় বসা ছেলেমেয়েদের প্রকৃতি উপভোগ, চুল খোলে জানালার পাশে বসা মেয়ে গুলোর চোখেমুখে আনন্দ, গলা ছেড়ে, শাটলের গায়ে দু হাত দিয়ে তবলা বাজিয়ে গান গাওয়া সব, সব কিছুই আমি মুগ্ধ হয়ে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছিলাম। মনে হচ্ছে নতুন কোন দেশে এসেছি, মানুষ গুলোকে নতুন মনে হলো। যাদের জীবনটা শুধুই আনন্দের। এরপর পরিচিত কিছু বান্ধবী দের সাথে শাটলে আসা যাওয়া শুরু করলাম। শাটলের প্রতিটা মূহুর্ত আমি সবার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। তাদেরকে বুঝতে চাইতাম। ভাবতাম আমিই হয়তো একজন যার কাছে অন্ধকার এসেছিল। হৈচৈ, গানের মাঝে ও মাঝে মাঝে শাটলের জানালা দিয়ে অদূর দিগন্তে মন চলে যেতো। এত ভীড়ের মধ্যে ও বিষণ্ণতা আমাকে ছেয়ে যেত। চারদিকে এতো বাতাস অথচ আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছিনা। আমার মনে গভীর হাহাকার চিৎকার করে উঠতো। এত মানুষের মাঝে প্রচন্ড অসহায় লাগতো। মনে হতো কোন বহিরাগত, বাকিরা চিনতে পারলে নামিয়ে দিবে সে ভয়ে জড়সড় হয়ে বসে আছি। আমি আর পারছিনা নিজের সাথে যুদ্ধ করতে। ভার্সিটি গেলে বাসায় আসার অস্থিরতা, বাসায় আসলে ভার্সিটি যাওয়ার অস্হিরতায় দিন গুলো কাটাচ্ছিলাম।
মানুষ থেকে দূরে দূরে থাকার প্রচেষ্টা হয়তো আমি নামক পদার্থ অন্য এক পদার্থ কে হঠাৎ নিজের করে নিলাম। শাটলের সেই এক ঘন্টা আস্তে আস্তে আমাকে সঙ্গ দিত। শাটলের বাইরে তাকিয়ে থাকা, ফসলি জমিগুলো ও রেলের পাশের বস্তিগুলো একে একে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়া, মন ভরে সুর মিলিয়ে গাওয়া গান, কাপলদের কেয়ারিং, শাটলে বসে পড়াশোনা, বন্ধুদের গোল হয়ে আড্ডা দেওয়া গুলো আস্তে আস্তে উপভোগ করা শুরু করলাম। শাটলের এই একঘন্টা অন্যদের ব্যস্ততা দেখে কেটে যেত। কয়েকদিন পর মনে হলো আমার কেমন জানি হালকা অনুভব হচ্ছে , শীতল বাতাসের এক ছোঁয়া সারা শরীরে বয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন খুব ভোরে উঠে তাড়াহুড়ো করে নিউ মার্কেট স্টেশনে সীট ধরতাম। মাঝে মাঝে একা, মাঝে মাঝে ক্লাসের বন্ধুদের সাথে বসতাম।তারা আনন্দ উল্লাসে সময়টা পার করতো আর আমি তাদের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। মাঝে মাঝে মুচকি হেসে তাদের সাথে এডজাস্ট করার চেষ্টা করতাম।
এইভাবে ঘুম থেকে উঠে শাটলে করে ক্যাম্পাসে যাওয়া, ক্লাস করে আবার শাটলে করে বাসায় ফেরা। এই রুটিনেই চলছিল দিনগুলো। অনেক মাস হয়তো। ক্লাস শেষে বন্ধুরা যখন দল বেঁধে নতুন ক্যাম্পাস ঘুরতো, বাসায় ফেরার অস্থিরতা আমাকে ঝেকে ধরতো। বাসায় ফিরতে পারলেই যেন বাঁচি। এই কারণে ক্যাম্পাসের অনেক জায়গা এখনো অদেখা রয়ে গেল। শাটলের সবার আনন্দের মূহুর্ত গুলো হয়তো আমাকে আস্তে আস্তে বিষন্নতা থেকে মুক্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছিল । তাদের দেখে মনে হতো জীবন টা কতো সুন্দর ও উপভোগের। ১ম বর্ষের শেষ দিকে নিজেকে হালকা মনে হতে লাগলো। ক্লাসের সবার সাথে মিশতে মন চাইতো,শাটলে পাশে বসা অপরিচিত কোন ফ্রেশারের সাথে টুকটাক কথা বলতে ইচ্ছে হতো। বন্ধুদের সাথে একসাথে আসতে মন চাইতো, মাঝে মাঝে তাদের জন্য সীট ধরা।
আমি আর একবার বাচার জন্য আশা করতে শুরু করলাম। বাসায় আসলে যদিও বরাবরের মতোই হতাশায় ডুবে যেতাম, সকাল হতেই অল্প আনন্দ, অল্প আশায় খাওয়াদাওয়া শেষ করে শাটলের জন্য ছুটতাম। নতুন ভালো লাগা আমার মন ছুঁয়ে যেত। আয়নায় নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে মন চাইতো। এইভাবে চলতে লাগল। নিজের চেষ্টা, নতুন ব্যস্ততা, নতুন পরিবেশ আস্তে আস্তে আমাকে হতাশা থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করেছে। শাটল কে আমার বন্ধু মনে হতে শুরু করলো। শুধু শাটলে যতক্ষণ থাকতাম ততক্ষণ অনেক ভালো লাগতো, নতুন করে বাঁচতে মন চাইতো। হ্যাঁ, পাথর দিয়ে পিষে দেওয়া মানুষ গুলো থেকে যখন দূরে দূরে থাকতাম ভয়ে, তখন মনে হতো এই শাটলই একমাত্র আমাকে শেল্টার দিবে বেঁচে থাকার।
কৈশোরে প্রথম প্রেম যেমন ফাল্গুনের মৃদু বাতাস।
লেখকঃ অপরিচিতা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক)।